Image description

এক সময়ের ঢাকার প্রাণবন্ত জলধারা ধোলাইপাড় খাল এখন মৃতপ্রায়। খালটিতে এখন নেই আর স্বচ্ছ পানিরধারা। কালচে, দুর্গন্ধযুক্ত ও আবর্জনায় পরিপূর্ণ খাল এখন ময়লার ভাগাড়। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই খালের পাশ দিয়ে চলাচল করলেও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দখল ও দূষণের কারণে খালটি এখন স্থানীয়দের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ। খালের আশপাশে ছড়িয়ে থাকা পচা ময়লা, প্লাস্টিক, বর্জ্য ও জমে থাকা নোংরা পানির কারণে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে মশার উপদ্রব যা স্থানীয়দের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে খালটি ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে খালে। অনেক জায়গায় খালের ওপর গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। কোথাও কোথাও খালের পানিপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এলেও তা সাময়িক। কয়েকদিন পরিষ্কার করার পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় খালটি। কারণ স্থায়ী কোনো নজরদারি বা ব্যবস্থাপনা নেই। খালের পাড়ে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে খালে ময়লা ফেলছেন বলে দাবি করেন কেউ কেউ। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও জমে থাকা নোংরা পানি মশার বংশবিস্তারের আদর্শ স্থান। বিশেষ করে এডিস মশা পরিষ্কার ও আধা-পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে জন্মালেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে অন্যান্য ক্ষতিকর মশার বিস্তারও দ্রুত ঘটে।

খালের আশপাশ ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে গৃহস্থালি বর্জ্য। পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল, পচা সবজি, পশুর বর্জ্য, এমনকি চিকিৎসা বর্জ্যও খালে ফেলা হচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির রং এতটাই কালো হয়ে গেছে যে সেটি পানি না তরল বর্জ্য তা বোঝা কঠিন। তীব্র দুর্গন্ধে স্থানীয়দের নাক-মুখ চেপে চলাচল করতে দেখা যায়। খালের এই বেহাল অবস্থার কারণে ব্যবসাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগর পরিকল্পনার অভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং খাল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় রাজধানীর অধিকাংশ খালের মতো ধোলাইপাড় খালও ধ্বংসের মুখে পড়েছে। খালগুলো শুধু পানি নিষ্কাশনের পথ নয়, এগুলো নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অব্যবস্থাপনা ও দখলের কারণে একের পর এক খাল হারিয়ে যাচ্ছে। খালগুলো বাঁচাতে না পারলে নগরের পানিবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়বে। ধোলাইপাড় খালের বর্তমান অবস্থা খুবই উদ্বেগজনক। এখানে দ্রুত পরিষ্কার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

ধোলাইপাড় এলাকার বাসিন্দা মো. দুলাল বলেন, এখন খালের দিকে তাকানোও যায় না। চারদিকে শুধু দুর্গন্ধ আর মশা। সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যায়। আমাদের বাচ্চারা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ডেঙ্গু, জ্বর, চর্মরোগ সবকিছু বাড়ছে।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজধানীর খালগুলো রক্ষা করা গেলে পানিবদ্ধতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কিন্তু খাল ভরাট ও দখলের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। ধোলাইপাড় খালের বর্তমান অবস্থাও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। সরকার খাল পুনরুদ্ধারের জন্য দখলদারদের একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করতে হবে। কোনো সরকারই খাল, নদী বা প্রাকৃতিক জলাধার দখলকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় না। এমনকি তাদের নিয়ে কোনো শ্বেতপত্রও প্রকাশ করা হয় না। পুরান ঢাকার যেসব খাল পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে সেগুলো পুনরুদ্ধার করাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। তবে এ খালগুলো ফিরিয়ে আনা না গেলে অন্য খাল ও নদী পুনরুদ্ধারের সুফলও মিলবে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। পরিচ্ছন্ন ও ডেঙ্গুমুক্ত ঢাকা গড়তে সহায়ক হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। পানিবদ্ধতা নিরসন ও জনভোগান্তি দূর করতে খালে পানিপ্রবাহ সচল করার কাজ শুরু করছি। বর্তমানে পানিপ্রবাহের দিক পরিবর্তন করে বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে যাতে দ্রুততম সময়ে পানি নিষ্কাশন সম্ভব হয়। এই প্রকৌশলগত পরিবর্তনের ফলে নিষ্কাশন পথ কমে আসবে এবং এলাকার পানিবদ্ধতা দূর হবে। খালের জায়গা দখলমুক্ত করা হবে।