Image description

আধুনিক গণতন্ত্রে রাজনীতি এবং অর্থনীতি এক সঙ্গে চলে। একটি আরেকটির ওপর নির্ভরশীল। গণতন্ত্র ছাড়া যেমন অর্থনীতি বিকশিত হয় না। ঠিক অর্থনীতি ঠিকঠাক মতো না চললে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে। আর বর্তমানে মুক্তবাজার অর্থনীতির বিশ্বে বেসরকারি খাত ছাড়া অর্থনৈতিক বিকাশ অলীক কল্পনা। বিশ্ব অর্থনীতি আজ দাঁড়িয়ে আছে বেসরকারি খাতের ওপর। বেসরকারি খাত শুধু কর্মসংস্থান করছে না আর্তমানবতার সেবা করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চেয়ে গরিব মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় বেশি অবদান রাখছে মেলিন্ডা-গেটস ফাউন্ডেশন। এমন উদাহরণ অনেক। তাই, একটা বড় করপোরেটের ক্ষতি মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় রকমের ক্ষতির শঙ্কা। এ কারণেই উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে বেসরকারি খাতকে সরকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অর্থনৈতিক যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বেসরকারি খাতের সঙ্গে পরামর্শ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এবং সিনেটের যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন নিয়মিত বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করে। দেশটিতে বেসরকারি খাতের প্রভাব এতটাই বেশি যে, প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেসের মধ্যে টানাপোড়েন মীমাংসায় তারা ভূমিকা রাখেন।

শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বেসরকারি খাতকে দেশ পরিচালনার অংশীদার মনে করে। জার্মানির গাড়ি প্রস্তুতকারীরা যখন কম খরচের জাপানি গাড়ির কাছে বিশ্ব বাজারে কোণঠাসা, তখন জার্মান সরকার গাড়িশিল্পকে চাঙা করতে লড়রহঃ পড়ড়ঢ়বৎধঃরড়হ ধমৎববসবহঃ বিল পাস করে। যেখানে জার্মান সহায়তায় প্রকল্পে জার্মান গাড়ি কেনার বিধান রাখা হয়। এটি একটি ছোট উদাহরণ মাত্র। বিশ্বের সব দেশের সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো বেসরকারি খাতকে বিকশিত করা। শুধু পশ্চিমা দেশগুলো নয় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এখন বেসরকারি উদ্যোক্তা, শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে।  এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ উল্লেখ না করলেই নয়। দেশটি দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। তাদের অর্থনীতি এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, বাংলাদেশের কাছ থেকেও তারা ঋণ নিয়েছিল। সেখানে গণ অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার বেসরকারি খাতের গলা টিপে ধরেনি। রাজাপক্ষের সঙ্গে যারা ব্যবসায়িকভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে বানোয়াট মামলা দেয়নি।

তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়নি। বরং নতুন সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য এসব ব্যবসায়ীর ওপর নির্ভর করে। তাদের সঙ্গে নিয়ে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। এভাবেই শ্রীলঙ্কা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ঈইঝখ) গভর্নর ড. পি নন্দলাল বীরাসিংহে, বলেছিলেন, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা কোনো দলের নয় তারা দেশের অর্থনীতির যোদ্ধা। গণতন্ত্রে এখন বেসরকারি খাতকে সরকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টাটা সফল হলে বিজেপির কী লাভ কিংবা বোয়িং ভালো ব্যবসা করলে কত কমিশন দেবে, এই চিন্তা তারা করে না। তারা চিন্তা করে দেশের মানুষের স্বার্থ। দেশের উন্নয়ন। টেকসই গণতন্ত্রের জন্য বলিষ্ঠ বেসরকারি খাতের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সব গণতান্ত্রিক সরকার বেসরকারি খাতের জন্য কাজ করে। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি। বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী হতে পারে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তির মাধ্যমে তাদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ রক্ষা করেছে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এতে বোয়িং কোম্পানির লাভ হবে। কিন্তু এটা শুধু বোয়িং কোম্পানির লাভ নয় এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির লাভ। 

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বা সরকার কখনো চিন্তা করে না, বোয়িংকে ব্যবসা এনে দিলে আমার কি লাভ? কিংবা রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট বোয়িংকে বড় ব্যবসা এনে দিয়েছে, কাল ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট এসে বোয়িং কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করবে না বা এই প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনবে না। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। এদেশের রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ ব্যবসায়ীদের হয় প্রতিপক্ষ বানাতে চান না হয় দলীয় ক্যাডারে পরিণত করতে চান। ওমুক ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগের আমলে ভালো ব্যবসা করেছে, অতএব তাকে এখন সাইজ কর। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নাও। পারলে তাকে ধ্বংস কর। কিন্তু কেউ একটা বারের জন্য চিন্তা করে না, এই ব্যবসায়ীর ক্ষতি করলে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হবে। বহু মানুষের কর্মসংস্থান বন্ধ হবে।  বাংলাদেশে দলীয় স্বার্থে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের বিবেচনা করার সংস্কৃতি শুরু থেকেই। এই যেমন ধরা যাক, আওয়ামী লীগের শাসনামলে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টুর মতো ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করতে দেওয়া হয়নি। তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। এতে এই ব্যবসায়ীদের যতটা না ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দেশের অর্থনীতির। এই ভুক্তভোগীরা এখন বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তারা নিশ্চয়ই জানেন এবং বোঝেন এ ধরনের সংকীর্ণ মানসিকতা কতটা ভয়াবহ। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে। তারা কেন অতীতের খারাপ চর্চা অনুসরণ করবে?

ভারতে যেমন মনমোহন সিংকে বলা হয় বেসরকারি খাতের বিকাশের মূল কারিগর। তেমনি বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির জনক হলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি দেশের দায়িত্ব নিয়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করেন। বিএনপি জিয়ার আদর্শের দল। তাদের অন?্যতম আদর্শের ভিত্তি হলো বেসরকারি খাতকে বিকশিত করা। গত ৫৪ বছরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নির্মম শিকার হয়েছে বেসরকারি খাত। না হলে এই দেশ আরও এগিয়ে যেত বহুদূর।

বাংলাদেশের সুশীল সমাজের একটি অংশ সব সময় উন্নয়নবিরোধী। বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে তারা দিনের পর দিন। এর কারণ হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি যেন কখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ না হয়। বিদেশি ঋণ বন্ধ হয়ে গেলে সুশীল সমাজের অনেকের আয়েশি জীবন তছনছ হয়ে যাবে। তাই সুযোগ পেলেই তারা বেসরকারি খাত ধ্বংসের জিঘাংসায় মেতে ওঠে। ২০০৭ সালে এক এগারোর সময় তারা বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তথাকথিত শীর্ষ দুর্নীতিবাজের তালিকা প্রকাশ করে বেসরকারি খাতকে বিকলাঙ্গে পরিণত করেছিল। সেই একই ধারায় ইউনূস সরকার এক এগারোর অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার মিশনে নেমেছিল। ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ, বিদেশ ভ্রমণে বাধা দিয়ে ইউনূস সরকার বেসরকারি খাতে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কলকারখানায় মব সন্ত্রাস, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নির্বিচারে হামলা, অগ্নিসংযোগ করে দেশের অর্থনীতিকে ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে ইউনূস সরকার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। আর তার জন্য দরকার দ্রুত পদক্ষেপ। বিএনপি সরকার আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ। তাহলে ইউনূস সরকারের আমলে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারে দেরি কেন? ব্যবসায়ী, সাংবাদিক কিংবা শিক্ষকরা কীভাবে হত্যা মামলার আসামি হন? এসব মামলা প্রত্যাহারে তিন মাস সময় লাগার কথা নয়।

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। আগামী মাসে নতুন সরকার প্রথম বাজেট পেশ করবে। এখন দেশ বাঁচাতে, গণতন্ত্র রক্ষায় অর্থনীতি বাঁচাতে হবে। অর্থনীতি বাঁচাতে হলে দরকার বেসরকারি খাতকে সচল করা। এজন্য অবিলম্বে বেসরকারি খাতের ওপর ইউনূস শাসনামলের  সব অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। সব বেসরকারি উদ্যোক্তাকে আস্থায় আনতে হবে। তাদের জন্য সৃষ্টি করতে হবে ভয়হীন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। ভয় আতঙ্কের মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব নয়, সম্ভব না ব্যবসা পরিচালনা। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে দেশের অর্থনীতি সচল হবে না। অর্থনীতি সচল না থাকলে সরকার যতই আন্তরিক থাকুক তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে না। তাই অনেক হয়েছে, বিরোধ হানাহানি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে পুড়েছে আমাদের সম্ভাবনা, আমাদের স্বপ্ন। ২০ কোটি মানুষের দেশটা হোক সবার। হিংসা বিদ্বেষ পেছনে ফেলে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। আর সেজন্যই বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে।