Image description

বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুল নীতি ও আমদানি-নির্ভরতার কারণে জ্বালানি খাত এক দশক পিছিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার গত ১৮ মাসে এ খাতে গতি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। উল্টো দিকে জ্বালানি খাতের প্রকল্প অনুমোদন ও দরপত্র পিছিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। দেশের চলমান জ্বালানি সংকট কাটাতে আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় অভ্যন্তরীণ গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর দিকে জোর দেয়া হচ্ছে। বর্তমান বিএনপি সরকার নিজস্ব নতুন নতুন কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাসের উত্তোলন বাড়িয়ে বিদেশ-নির্ভরতা কমাতে চায়। ইতোমধ্যেই চীনের সিনোপেক ইন্টারন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম সার্ভিস করপোরেশনকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া; চীনের প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি চুংকুইং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দেশীয় গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খনন ও পুরনো কূপ সংস্কারের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পগুলোতে চীনের সিনোপেক-এর প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম ইনকিলাবকে বলেছেন, গত এক দশকে বিগত সরকারের ভুল নীতি ও আমদানি-নির্ভরতার কারণে জ্বালানি খাত দেশ পিছিয়েছে। এবার সরকারের নেয়া পরিকল্পনায় হতাশ না হলেও আশাবাদী।

চীন নিজস্ব প্রযুক্তিতে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি করছে এবং তাদের মোট উৎপাদনের ৪৩ শতাংশই আসে অস্বাভাবিক উৎস শেল গ্যাস, কোল-বেড মিথেন থেকে। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস ফিল্ডে পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার গভীর কূপ খননকাজ চালু করছে। দেশে গ্যাস ও তেলের উৎপাদন বাড়াতে গভীর শিলাস্তরে অনুসন্ধান জোরদারের অংশ হিসেবে তিন অনুসন্ধান কূপ খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে দুটি গ্যাসকূপ এবং একটি তেলকূপ রয়েছে। এসব কূপ খনন করতে ব্যয় হবে ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ ৯৫ হাজার ৬৩৫ টাকা। তিনটি কূপই খনন করবে চীনের প্রতিষ্ঠান। গত ৩০ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই কূপ খননের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে দুটি কূপের (শ্রীকাইল ডিপ-১ ও মোবারকপুর ডিপ-১) খনন কার্যক্রম টার্ন-কি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

‘তিনটি অনুসন্ধান কূপ খনন’ প্রকল্পের আওতায় দুটি কূপ (শ্রীকাইল ডিপ-১ ও মোবারকপুর ডিপ-১) খনন কার্যক্রম টার্ন-কি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের লক্ষ্যে এক ধাপ দুই খাম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে তিনটি দরপত্র দাখিল হয়। এর মধ্যে মাত্র একটি দরপত্র কারিগরি ও আর্থিকভাবে উপযোগী হয়। দরপত্রের সব প্রক্রিয়া শেষ। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ কোটি ৯৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৭৯ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৭১৩ কোটি ৬৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা। প্রস্তাবটি সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উপস্থান করা হলে কমিটি তা অনুমোদন দিয়েছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের আরেক প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ‘সিলেট-১২ নং কূপ খনন’ প্রকল্পের আওতায় আনুষঙ্গিক কাজসহ কূপ খনন কার্যক্রম টার্ন-কি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। সিলেট-১২ নং কূপ খনন প্রকল্পের আওতায় আনুষঙ্গিক কাজসহ কূপ খনন কার্যক্রম টার্ন-কি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের লক্ষ্যে এক ধাপ দুই খাম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে দুটি দরপত্র দাখিল হয়। দুটি দরপত্রই কারিগরি ও আর্থিকভাবে রেসপনসিভ হয়। দরপত্রের সব প্রক্রিয়া শেষে টিইসির সুপারিশে রেসপনসিভ সর্বনি¤œ দরদাতা চীনের প্রতিষ্ঠান সিনোপেক ইন্টান্যাশনাল পেট্রোলিয়াম সার্ভিস করপোরেশনকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ৬২ লাখ ২২ হাজার ৪৫০ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ২৩২ কোটি সাত লাখ ২৫ হাজার ৬৩৫ টাকা। দেশে তেল-গ্যাসের তিন কূপ খনন করবে চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

নতুন অনুসন্ধান ব্লক চিহ্নিত করা, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র পুনর্মূল্যায়ন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলতি বছরের মধ্যে ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই প্রান্তিক মানুষের জীবনমান বাড়াতে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড। ইতোমধ্যে এই দুটি কার্ডই চালু হয়েছে এবং সুফল ভোগ করছেন কার্ডধারীরা। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়া পরে এবার দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উত্তোলনে জোর দিয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস ফিল্ডে নতুন একটি অনুসন্ধান কূপের খননকাজ শুরু হয়েছে। তিতাস-৩১ নামের পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার গভীর এই কূপটি দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গভীর গ্যাসকূপ কাজ চলছে। এই কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎস অনুসন্ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন ব্লকে নতুন অনুসন্ধান কাজ জোরদার করা হচ্ছে।টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য জ্বালানি সরবরাহ করা এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখা-নিশ্চিত করা, প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করা, সব এলাকা এবং সব আর্থ-সামাজিক গোষ্ঠীকে দেশীয় প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ করা, দেশীয় জ্বালানি সম্পদের বহুমুখীকরণ, কয়লা সম্পদকে জ্বালানির বিকল্প উৎস হিসেবে গড়ে তোলা, গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের উন্নতির জন্য সিএনজি, এলএনজি ও এলপিজির উন্নয়ন করা, দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ রাখা, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গ্যাসের দক্ষ ব্যবহার উৎসাহিত করা পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০টি এবং আগামী ২০২৬-২৮ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা কাজ করছে পেট্রোবাংলার। গত ১৯ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় এই খননকাজের উদ্বোধন করা হয়।

গত ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনের জ্বালানি মন্ত্রী বলেছেন, বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত অবশিষ্ট মজুদ গ্যাসের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এবং বর্তমানে কম-বেশি দৈনিক এক হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ করা হলে ওই অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আনুমানিক ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে। নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, পেট্রোবাংলা কর্তৃক ৫০ থেকে ১০০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মপরিকল্পনার আওতায় আজ পর্যন্ত ২৬টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কূপগুলো খনন এবং ওয়ার্কওভারের লক্ষ্যে কার্যক্রম বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান। বাপেক্স কর্তৃক সিসমিক সার্ভের আওতায় ব্লক-৭ ও ৯-এ প্রায় তিন হাজার ৬০০ কিলোমিটারের ডেটা আহরণ করে উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের কাজ চলমান। বিজিএফসিএল কর্তৃক হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনার এক হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় থ্রি-ডি সিসমিক ডেটা আহরণের কার্যক্রম শুরু হবে। পাশাপাশি বাপেক্স কর্তৃক ভোলার চরফ্যাশনের ৬৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকায়, জামালপুরে ৬৫০ বর্গকিলোমিটার, বিজিএফসিএল কর্তৃক তিতাস, হবিগঞ্জ এবং নরসিংদী-সংলগ্ন ৬৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এবং এসজিএফএল কর্তৃক লামিগাঁও, লালাবাজার, গোয়াইনঘাট, কৈলাশটিলা সাউথ এবং ফেঞ্চুগঞ্জ ওয়েস্ট স্ট্রাকচারে ৮৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় থ্রি-ডি সিসমিক জরিপ সম্পাদনের নিমিত্তে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক ইনকিলাবকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস ফিল্ডে নতুন একটি অনুসন্ধান কূপের খননকাজ শুরু হয়েছে। তিতাস-৩১ নামের পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার গভীর এই কূপটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর গ্যাসকূপ কাজ চলছে। প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে আশা করছি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়লে শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল হবে। এতে ঘন ঘন গ্যাস সংকটের ঝুঁকি কমবে এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধানকে মূল লক্ষ্য ধরে আমদানি বাড়ানোর পরিবর্তে নিজেদের সম্পদ কাজে লাগিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের জ্বালানি সংকট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং রিজার্ভের ওপর চাপও হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এলএনজি আমদানিতে প্রতি বছর বিপুল ডলার ব্যয় হয়। স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন বাড়ালে সেই ব্যয় সাশ্রয় হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে স্বস্তি দেবে।

 বিগত সরকারের ভুল নীতি ও আমদানি-নির্ভরতার কারণে জ্বালানি খাত এক দশক পিছিয়েছে। শিল্প ও বিশেষজ্ঞদের দাবি, আগেই দেশীয় উত্তোলনে গুরুত্ব দেয়া হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড-বিজিএফসিএল পরিচালিত তিতাস গ্যাস ফিল্ডের ২২টি কূপ থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস উত্তোলনের ফলে ফিল্ডটির কূপগুলোর চাপ ও মজুদ কমে যাওয়ায় উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে থ্রি-ডি সিসমিক জরিপ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এর আওতায় তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডে দুটি গভীর অনুসন্ধান কূপ খনন করা হচ্ছে। তিতাসের নতুন কূপটি প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় খনন করা হবে, যা শেষ হতে সময় লাগবে প্রায় সাত মাস। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসিডিসি এ কাজ বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ দু’হাজার ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, গত এক যুগে দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেয়া হয়নি। সরবরাহ ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে শুরু হয় এলএনজি আমদানি। বিশ্ববাজারে দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় ২০২২ সালের জুলাই থেকে টানা সাত মাস খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ করে দেয় সরকার। দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ওই সময় তাড়াহুড়ো করে নেয়া হয় ৫০টি কূপ বাস্তবায়নের প্রকল্প। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে না বলে সে সময় শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পেট্রোবাংলা ও তিন কোম্পানির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বছরে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনটি কূপ খননের অভিজ্ঞতা আছে বাংলাদেশের। কূপ খননে ডিপিপি অনুমোদনেই লাগে এক বছরের বেশি। জমি অধিগ্রহণ ও যন্ত্রপাতি কিনতে লাগে কয়েক মাস। খনন শুরুর পর অনুসন্ধান বা উন্নয়ন কূপের কাজ শেষ করতে লাগে অন্তত সাড়ে তিন মাস। সংস্কার কূপ খননে লাগে দুই মাস। একাধিক বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে কাজ করাতে পারলে হয়তো বেশি কূপ খনন করা সম্ভব। গত ১২ নভেম্বর দেশের গ্যাস সংকট নিরসনে বাপেক্স কর্তৃক ১১টি গ্যাসকূপের খনন ও ওয়ার্কওভার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

কার্যক্রম শেষে কূপগুলো থেকে দৈনিক ১৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। এতে বলা হয়, কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সময়াবদ্ধ পরিকল্পনার মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য বাপেক্সের নিজস্ব পাঁচটি রিগ এবং টার্ন-কি পদ্ধতিতে নিয়োজিত চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদারের তিনটি রিগসহ মোট আটটি রিগের মাধ্যমে কূপ খনন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গত ২৭ নভেম্বর থেকে টার্ন-কি পদ্ধতিতে নিয়োজিত চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদারের রিগ দ্বারা তিতাস-২৮ উন্নয়ন কূপ খনন কার্যক্রম শুরু হবে। চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে বিজিএফসিএলের সঙ্গে টার্ন-কি পদ্ধতিতে নিয়োজিত চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদারের আরো একটি রিগের মাধ্যমে তিতাস-৩১ ডিপ অনুসন্ধান কূপের খনন কার্যক্রম শুরু করেছে পেট্রোবাংলা। এছাড়া ভোলা এলাকায় পাঁচটি কূপ খননের লক্ষ্যে বাপেক্স ও টার্ন-কি পদ্ধতিতে নিয়োজিত চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ফলে ভোলা এলাকায় কূপ খননের লক্ষ্যে আরো একটি রিগ নিয়োজিত হবে। বাপেক্সের পাঁচটি রিগ এবং টার্ন-কি পদ্ধতিতে নিয়োজিত চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদারের ছয়টি রিগসহ মোট ১১টি রিগের মাধ্যমে একই সাথে মোট ১১টি কূপের খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম চলমান থাকবে। বাপেক্স কর্তৃক খনন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বাপেক্সের পাঁচটি রিগের পাশাপাশি আরো দুটি নতুন রিগ ক্রয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। 

উল্লিখিত ১১টি কূপের খনন কার্যক্রম শেষে আনুমানিক দৈনিক ১৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত করা যাবে। ফলে দেশের নিজস্ব গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) চার বছরে ৫০টি কূপে কাজ করার পরিকল্পনা নেয়া হয় ২০২২ সালে। বিগত সরকারের সময় থেকেই এটি ধীরগতিতে এগোয়। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর গতি বাড়ালেও প্রকল্প অনুমোদন ও দরপত্রে পিছিয়ে যায় কাজ। এটি শেষ করার আগেই আরো ১০০টি কূপ খনন প্রকল্পের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ৫০টি কূপের কাজ শেষে দিনে নতুন করে ৬২ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনে যুক্ত হওয়ার কথা। ২০টি কূপের খনন শেষে দিনে ২১ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুক্ত হয়েছে মাত্র ৯ কোটি ঘনফুট। ছয়টি কূপের কাজ চলছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) পাঁচটি রিগ (খননযন্ত্র) ও চুক্তিতে নিয়োজিত কোম্পানির দুটিসহ সাতটি রিগ কাজে আছে। ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তিতে নিয়োজিত কোম্পানির আরো তিনটি রিগ কাজে যুক্ত হবে। এরপর একসাথে ১০টি রিগ খননের কাজ করবে। তিনটি কোম্পানি গ্যাস উত্তোলনে যুক্তবাপেক্স, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড-বিজিএফসিএল ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড-এসজিএফএল। এর মধ্যে একমাত্র বাপেক্সের কূপ খননের সক্ষমতা আছে। আর বাকি দুটি কোম্পানি ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ করায়।