Image description

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মালিকানাগত চাপের বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য দিয়েছেন শিল্প ও গণমাধ্যম উদ্যোক্তা এ কে আজাদ। তিনি বলেছেন, তার মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম সমকাল ও চ্যানেল ২৪-এর সাংবাদিকেরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেছেন তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য এবং সেখানে কর্মরত প্রায় ৭৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।

রাজধানীর একটি হোটেলে আজ শনিবার আয়োজিত বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এ কে আজাদ বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, সৎ সাংবাদিকতা কিংবা গণতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবতায় তার কাছে প্রথম বিবেচ্য হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা। তিনি বলেন, “আমার যে চ্যানেল ২৪ এবং সমকাল—এখানে সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। কেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না? তার মূল অন্তরায় কারণ আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।”

দেশের গণমাধ্যম বাস্তবতায় এমন স্বীকারোক্তি বিরল। কারণ, সাধারণত সংবাদমাধ্যমের মালিকেরা সম্পাদকীয় নীতিতে প্রভাবের অভিযোগ অস্বীকার করেন। সেখানে এ কে আজাদ সরাসরি স্বীকার করেছেন, ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে সীমিত করে। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি প্রস্তাবও দিয়েছেন, যা দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তিনি বলেছেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে তিনি তার মালিকানাধীন ‘সমকাল’ অথবা ‘চ্যানেল ২৪’-এর যেকোনো একটিকে ট্রাস্টের হাতে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, “আমি সমকাল বা চ্যানেল ২৪-এর মধ্যে যেকোনো একটিকে ট্রাস্ট করে দিতে চাই, যদি আপনারা দায়িত্ব নেন।” গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত উপলব্ধির প্রকাশ নয়; বরং দেশের সংবাদমাধ্যম কাঠামোর একটি গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশে অধিকাংশ বড় গণমাধ্যমের মালিকানা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে। ফলে সংবাদ পরিবেশনে প্রায়ই ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। এ কে আজাদের বক্তব্য সেই বাস্তবতার একটি প্রকাশ্য স্বীকৃতি।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ঝুঁকি ও চাপের বিষয়েও বিস্তারিত কথা বলেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হলে প্রথম চাপটি আসে মালিকপক্ষের ওপর। সাংবাদিক যখন অভিযুক্ত ব্যক্তির মন্তব্য নিতে যান, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরাসরি সংবাদমাধ্যমের মালিককে ফোন করেন এবং সংবাদটি প্রকাশ বা সম্প্রচার না করার অনুরোধ জানান। এরপরও কাজ না হলে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা সরকারের উচ্চপর্যায়কে ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ করা হয়।

এ কে আজাদের এই বক্তব্য সংবাদমাধ্যমের বহুল আলোচিত কিন্তু কম স্বীকৃত একটি বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বড় বাধা শুধু তথ্য সংগ্রহের জটিলতা নয়; বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ মোকাবিলা করা। বিশেষ করে ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত থাকলে সংবাদমাধ্যম মালিকেরা অনেক সময় আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নেন।

এ কে আজাদ বলেন, অনেক সময় তিনি নিজেই সাংবাদিকদের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। কিন্তু তখন সাংবাদিকদের কাছ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। সাংবাদিকেরা তাকে বলেন, দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ না করা হলে তথ্যদাতারা মনে করতে পারেন, কোনো সমঝোতা বা আর্থিক বিনিময়ের মাধ্যমে সংবাদটি গোপন রাখা হয়েছে। এতে সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই জায়গাটিকেই তিনি তার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হিসেবে তুলে ধরেন। তার ভাষায়, একদিকে সাংবাদিকের স্বাধীনতা, অন্যদিকে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা—এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে তাকে চলতে হয়। তিনি স্বীকার করেন, একজন গণমাধ্যম উদ্যোক্তা হিসেবে এই বাস্তবতা তার ব্যক্তিগত বিবেককেও নাড়া দেয়।

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, এ কে আজাদের বক্তব্য দেশের সংবাদমাধ্যম কাঠামোর অন্তর্নিহিত সংকটকে স্পষ্ট করেছে। অধিকাংশ বড় গণমাধ্যম ব্যবসায়ী মালিকানায় পরিচালিত। ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তার মধ্যে একটি স্থায়ী টানাপোড়েন থাকে। এ কে আজাদ যেটি বলেছেন, সেটি অনেকের অপ্রকাশিত বাস্তবতা।

তারা বলেন, পশ্চিমা অনেক দেশে ট্রাস্টভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের উদাহরণ রয়েছে। সেখানে মালিকানা কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়, যাতে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত সরাসরি ব্যবসায়িক স্বার্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়। দেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

এ কে আজাদ তার বক্তব্যে গণমাধ্যম মালিকানার প্রকৃতি নিয়েও কথা বলেন। তার মতে, বর্তমানে দুই ধরনের মানুষ গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করছেন। একদল সমাজের দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থপাচার ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করার উদ্দেশ্যে সংবাদমাধ্যম গড়ে তুলছেন। অন্যদিকে আরেকটি অংশ নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা, অবৈধ অর্থ কিংবা অনিয়ম আড়াল করার উদ্দেশ্যে গণমাধ্যমের মালিক হচ্ছেন।

অভিজ্ঞদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ সংবাদমাধ্যমের মালিকানার রাজনৈতিক অর্থনীতিকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যম শুধু সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যবসায়িক দরকষাকষি এবং ক্ষমতার অংশ হয়ে ওঠে। ফলে মালিকানা কাঠামো সাংবাদিকতার চরিত্রকে প্রভাবিত করে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু সাংবাদিকের সাহস যথেষ্ট নয়; প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, আইনি নিরাপত্তা এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতাও জরুরি।

এ কে আজাদও একই ধরনের বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যদি গণমাধ্যম মালিকদের জন্য এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, যেখানে হয়রানি, গ্রেপ্তার বা ব্যবসা পরিচালনায় প্রশাসনিক বাধার আশঙ্কা থাকবে না, তাহলে মালিকপক্ষও সাংবাদিকদের কাজের ওপর অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে না।

তার বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা। তিনি বলেন, সৎ সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন এবং পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কালো টাকার মালিকদের প্রভাব থেকে গণমাধ্যমকে রক্ষা করাও সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।

সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং মালিকপক্ষের চাপের অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেক প্রতিবেদক দ্বৈত চাপের মুখে পড়েন—একদিকে ক্ষমতাকাঠামোর চাপ, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা।

এ কে আজাদের বক্তব্যকে তাই অনেকে কেবল ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে দেখছেন না; বরং দেশের গণমাধ্যম কাঠামোর একটি প্রতীকী স্বীকারোক্তি হিসেবে বিবেচনা করছেন। বিশেষ করে তিনি যখন প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে তার প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকেরা পুরোপুরি স্বাধীন নন এবং একই সঙ্গে একটি সংবাদমাধ্যম ট্রাস্টের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন, তখন তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করে।

তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, ট্রাস্টভিত্তিক মালিকানা কি বাস্তবে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারবে? নাকি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে সংকটের ধরন শুধু বদলাবে?

গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু মালিকানার প্রশ্ন নয়; এটি আইনের শাসন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক আচরণ এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তারপরও এ কে আজাদের বক্তব্য অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, গণমাধ্যম অঙ্গনে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও ব্যবসায়িক বাস্তবতার দ্বন্দ্ব এখন আর গোপন কোনো আলোচনা নয়; তা প্রকাশ্য বিতর্কে পরিণত হয়েছে।