রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জনের মৃত্যু হয়। এসব লাশ পরিবহণের জন্য প্রয়োজন হয় অ্যাম্বুলেন্স। আর এই অ্যাম্বুলেন্স ঘিরেই গড়ে ওঠা এক চক্র মৃত রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে অমানবিকভাবে তিন থেকে চারগুণ ভাড়া আদায় করছে। এ সিন্ডিকেটের নির্ধারিত অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্সের চালক লাশ পরিবহণ করতে আগ্রহী হলে তাদের মারধর করে ভাগিয়ে দেওয়া হয়। এই সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করছেন আওয়ামী লীগ নেতা জানে আলম জনি। তার এক ভাই এবং তিনি বিএনপি ও যুবদলের দুই নেতাকে ‘ম্যানেজ’ করে নিয়ন্ত্রণ করছেন চক্রটি। আওয়ামী লীগ নেতা জনি দেড় যুগ ধরে একচেটিয়াভাবে এই অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। লাশবাহী ফিটনেসবিহীন অ্যাম্বুলেন্সগুলো এখন হয়ে উঠেছে এই চক্রের টাকা বানানোর মেশিন। এছাড়াও তারা শতাধিক দোকান, হোটেল ও স্ট্যান্ডে প্রতিদিন অর্ধলক্ষ টাকা চাঁদাবাজি করছেন। নির্যাতিত ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথোপকথন আর যুগান্তরের সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিন্ডিকেটের বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্সচালক লাশ পরিবহণের চেষ্টা করলে তাদের নির্যাতন করা হচ্ছে। এ সিন্ডিকেটের দাপট, ক্ষমতা আর অর্থের কাছে অসহায় সাধারণ চালকরা। কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। অভিযোগ উঠেছে, রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) ট্রাফিক বিভাগ এবং হাসপাতালসংলগ্ন লক্ষ্মীপুর পুলিশ বক্সের সদস্যদের ‘ম্যানেজ’ করতে দেওয়া হচ্ছে চাঁদাবাজির টাকার নির্দিষ্ট একটি অংশ। আর এসবের সঙ্গে হাসপাতালে কর্মরত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরাও সম্পৃক্ত।
ভুক্তভোগী অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকরা বলছেন, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট দেড় যুগ ধরে নিয়ন্ত্রণ করছেন রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানা আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ৮নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জানে আলম জনি। তিনি মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সমবায়বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বেও রয়েছেন। হাসপাতালসংলগ্ন সিপাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় জনি ও তার বাহিনীর ক্ষমতার আস্ফালন আরও বেশি।
জনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এএইচ খায়রুজ্জামান লিটন এবং তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। লিটনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও রয়েছে জনির চরম সখ্য। আওয়ামী জমানায়ই তিনি হয়ে ওঠেন ক্ষমতাশালী। হয়েছেন অঢেল সম্পদ আর বিত্তবৈভবের মালিক। আর অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটটি পরিচালনায় জনির প্রধান সহযোগী হিসাবে কাজ করছেন তার চাচাতো ভাই সাদ্দাম হোসেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, জনি ও সাদ্দাম সিন্ডিকেটের রয়েছে ২৫টি অ্যাম্বুলেন্স। এছাড়া জনির চাচা নিপু ও বিপ্লবের দুটি করে চারটি এবং সাদ্দামের ভাই লালমুনের আরও চারটি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এসব অ্যাম্বুলেন্সের সবই ১৯৯০ সালের কাছাকাছি মডেলের। এগুলো ফিটনেসবিহীন। হাসপাতালে কোনো রোগী মারা গেলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডগুলোর বয় এবং দালালরা সিন্ডিকেটের সদস্য তরুণ, সুজন, নিশান এবং কালো জনিকে অবহিত করেন। এরপর সিন্ডিকেটের এ চার সদস্য মৃত রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ভাড়ার ব্যাপারে রফাদফা করেন। এ সময় সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য অ্যাম্বুলেন্সের মালিক কিংবা চালকদের ভিড়তে দেন না তারা। মৃত রোগীর স্বজনরা ইচ্ছা করলেও সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য কোনো চালকের অ্যাম্বুলেন্স নিতে পারেন না। আর এক্ষেত্রে অন্য চালকরা এগিয়ে এলে তাদের মারধর করা হয়। ২০ দিনের মধ্যে ডলার, পলক, ফিরোজ, ববি, তুহিন, নাঈম, মিলন ও মুন্না নামের চালকদের মারধর করেছেন জনি ও সাদ্দাম সিন্ডিকেটের সদস্যরা। ২৬ এপ্রিল মহানগরীর কাজিহাটা এলাকার ডলার নামে এক চালককে ২০ হাজার টাকা চাঁদার দাবিতে সাদ্দাম, পটলাসহ কয়েকজন মারধর করেন। এ ঘটনায় চালক ডলার রাজপাড়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন।
চারগুণ ভাড়া আদায় : রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে লাশ পরিবহণের ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৩০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু এটা না মেনে তারা অস্বাভাবিক বেশি ভাড়া নিচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অ্যাম্বুলেন্সচালক জানান, ২ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন মৃত রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে চারগুণ ভাড়া নিয়েছে তারা। এ দুটি জেলার দূরত্ব যাওয়া-আসা মিলে ১০০ কিলোমিটার। কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারিত ৩০ টাকা। এ হিসেবে ভাড়া আসে তিন হাজার টাকা। কিন্তু নেওয়া হয়েছে ১২ হাজার টাকা।
৪ মে একই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে সিন্ডিকেটটি। কুষ্টিয়ার এক রোগীর লাশ পরিবহণের ক্ষেত্রে আদায় করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়ার দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। যাওয়া-আসা মিলে ২৪০ কিলোমিটার। প্রকৃত ভাড়া হওয়ার কথা ৭ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু সিন্ডিকেট জোরপূর্বক বেশি ভাড়া আদায় করেছে। আর এরকম ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।
জনি বাহিনীর বেপরোয়া চাঁদাবাজি : রাজশাহী মেডিকেল কলেজের প্রধান ফটকের সামনে থেকে নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের হায়দার আলী ছাত্রাবাস পর্যন্ত আধা কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের ফুটপাতে নানা ধরনের শতাধিক অস্থায়ী বা ভ্রাম্যমাণ দোকান। ফলে এ এলাকায় প্রতিনিয়ত যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে নাগরিক ভোগান্তি। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিনশ টাকা করে চাঁদা নেয় সাদ্দাম এবং তার সহযোগীরা। ক্যাশিয়ার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন পটলা নামের সাদ্দামের এক সহয়োগী। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে রয়েছে ১০টি খাবারের হোটেল। এ হোটেলগুলো থেকে প্রতিদিন ১ হাজার টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। সাদ্দামের ১৫ থেকে ২০ জন সহযোগী এসব হোটেলে ক্ষমতার দাপটে বিনামূল্যে খাবার খান। এছাড়া সড়কের এক পাশে এবং হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের অভ্যন্তরে দেড় শতাধিক অ্যাম্বুলেন্স থাকে। এসব অ্যাম্বুলেন্সের প্রতিটি থেকে মাসে এক হাজার টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ফুটপাতের দোকান, হোটেল, স্ট্যান্ডের অ্যাম্বুলেন্স এবং অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে জানি বাহিনী প্রতিদিন অর্ধলক্ষ্য টাকা চাঁদাবাজি করছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব চাঁদাবাজির নির্দিষ্ট একটি অংশ আরএমপির ট্রাফিক বিভাগের সদস্য এবং লক্ষ্মীপুর পুলিশ বক্সের সদস্যদের দিতে হয়।
অভিযোগের বিষয়ে আরএমপি ট্রাফিক বিভাগের প্রধান উপকমিশনার মো. নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের উৎকোচ কিংবা মাসোহারা নেওয়ার বিষয়ে তথ্য বা প্রমাণাদি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা যানজট নিরসনের জন্য উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছি।’
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে লক্ষ্মীপুর পুলিশ বক্সের ইনচার্জ এসআই শাহ আলম বলেন, ‘চাঁদাবাজির বিষয়ে আমার জানা নেই। আমাদের কোনো সদস্য চাঁদা নেয়, এ রকম শুনিনি। এ ধরনের অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন।’
এলাকায়ই রয়েছেন সিন্ডিকেটপ্রধান জনি : আওয়ামী লীগ নেতা জনির বিরুদ্ধে আরএমপি সদর দপ্তরে টেন্ডার ছিনতাইয়ের মামলা রয়েছে। এটি আওয়ামী জমানাতেই ঘটে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জনির বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। জনি কিছুদিন বাইরে থাকলেও বর্তমানে এলাকায়ই রয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। রামেক হাসপাতালসংলগ্ন জনির এলাকা সিপাইপাড়ার স্থানীয়রা জানান, জনি ইতোমধ্যে নিজেকে বাঁচাতে ভোল পালটে রাজশাহী মহানগর বিএনপি এবং যুবদলের দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। পাড়া-মহল্লার বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদেরও ‘ম্যানেজ’ করেছেন।
বক্তব্য জানার জন্য আওয়ামী লীগ নেতা জনির মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে দু-একটি ক্ষেত্রে বেশি ভাড়া আদায়, ফিটনেসবিহীন অ্যাম্বুলেন্সের কথা স্বীকার করে জনির চাচাতো ভাই সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমাদের কোনো সিন্ডিকেট নেই। তেল-গ্যাসের দাম বাড়ায় ভাড়া কিছুটা বেশি নেওয়া হচ্ছে। মৃত রোগীর স্বজনদের জিম্মি করা এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ ভিত্তিহীন। আর অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালককে মারধরের অভিযোগও মিথ্যা।’
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শকর কে বিশ্বাস বলেন, আমাদের হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ফিক্সড। এর বাইরে যারা প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স চালান, তারা ভাড়া বেশি নিলে আমাদের কিছু করার থাকে না। বিষয়টি সুরাহার জন্য প্রশাসন, পুলিশসহ সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করেছি। আমরাও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।