Image description
আগাম ফলে সক্রিয় কেমিক্যাল সিন্ডিকেট

আগাম ফলের বাজার দখলে নিয়েছে কেমিক্যাল সিন্ডিকেট। অতি মুনাফার আশায় মৌসুম শুরুর আগেই অপরিক্ব আম-লিচুতে কার্বাইড, ইথোফেন ও বিভিন্ন হরমোন ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। বাইরে থেকে টকটকে হলুদ বা লাল দেখালেও বাসায় নেওয়ার পর অনেক ফলের ভেতর মিলছে কাঁচা ও স্বাদহীন অবস্থা। অথচ এসব ফলই বাজারে দ্বিগুণের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রকাশ্যে এমন কারসাজি চললেও নেই কার্যকর নজরদারি। ফলে একদিকে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা, অন্যদিকে নীরবে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিলতাসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে পুরো জাতিকে।

গত ২৯ এপ্রিল সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে কেমিক্যাল ও কার্বাইড দিয়ে পাকানো প্রায় ৯ হাজার কেজি অপরিপক্ব আম জব্দ করে পুলিশ। সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ এই চালানটি জব্দ করে। পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাত ২টার দিকে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশের একটি দল বিশেষ অভিযান চালায়। এ সময় সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামগামী একটি ট্রাক তল্লাশি করে ৩৫১ ক্যারেট আম জব্দ করা হয়। যার ওজন প্রায় ৯ হাজার কেজি। এসব আম কেমিক্যাল ও কার্বাইড ব্যবহার করে অপরিপক্ব অবস্থাতেই পাকানো হয়েছিল।

এদিকে প্রতিদিনের মতো শনিবারও রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ও পাড়া-মহল্লায় দোকান বসিয়ে বিক্রি করা হয়েছে এসব ফল। এর মধ্যে বাজারে আমের মধ্যে গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, গুটি, কাটিমন, বৃন্দাবনীসহ বিভিন্ন জাতের আম বলে বিক্রি করতে দেখা গেছে। জাত ও আকারভেদে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। যা রাজধানীর পাইকারি আড়ৎ বাদামতলীতে জাত ও আকারভেদে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। পাশাপাশি খুচরা বাজার থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার ফলের দোকানে প্রতি ১০০টি লিচুর ছড়া ৪৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মো. আমিনুল ইসলাম কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তার সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, গত বুধবার অফিস শেষ করে নয়াপল্টন থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে টসটসা হদুল লাল রঙের আম দেখে দোকানে থামলাম। বাচ্চার জন্য নিলাম। পাকা আম দেখে বাসায় সবাই পছন্দও করল। আম কাটতে গিয়ে দেখলাম উপরে পাকা রঙ আর ভেতরে কাঁচা। তবুও বছরের প্রথম আম বলে সবাই খেয়ে নিলাম। তবে বিপদ শুরু হয় মধ্যরাত থেকে। হঠাৎ বাচ্চা কান্না করে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। ওর সঙ্গে সবাই জেগে উঠলাম। জানতে চাইলে বলে পেটে ব্যথা করছে। পুরো রাত এমন করেই পার হলো। কী এক ভোগান্তির রাত ছিল।

শনিবার নয়াবাজার থেকে আম কিনে লিচুর দাম কষছেন মো. সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, এখন আম দেখে কিনলাম। ধরেই নিচ্ছি ভালো হবে না। তার পরও লোভ সামলাতে পারলাম না। কেজিপ্রতি ২৫০ টাকা পড়েছে। আর লিচুর দাম চাইছে ৮০০ টাকা। বিক্রেতারা এসব ফল আগাম এনে অতি মুনাফা করতে বসেছে। কেউ কিছুই বলছে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, অপরিপক্ক আম ও লিচু পাকাতে অনেক সময় ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং বিভিন্ন হরমোন যেমন- ইথোফেন বা রাইপেনিং ব্যবহার করা হয়। এতে মানবদেহে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। কার্বাইড মূলত শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিক। যা ফলের সংস্পর্শে এসে আর্দ্রতার সাথে বিক্রিয়া করে অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে। এই কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ফল খাওয়ার ফলে মানবদেহে স্বাস্থ্য সমস্যা হয়। এর মধ্যে- কার্বাইড পেটের ভেতর প্রদাহ সৃষ্টি করে, যার ফলে তীব্র পেট ব্যথা, বমি, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া এবং পেট জ্বালাপোড়া হতে পারে। অ্যাসিটিলিন গ্যাসের প্রভাবে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, মানসিক বিভ্রান্তি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং খিঁচুনি হতে পারে। রক্তে শর্করা কমে যায়। অপরিপক্ক লিচুতে মিথাইলিন সাইক্লোপ্রোপাইলগ্লাইসিন নামক প্রাকৃতিক উপাদান থাকে। এটি খালি পেটে খেলে শিশুদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যায়, যা এনসেফালোপ্যাথি বা মস্তিষ্কের মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে কার্বাইডে আর্সেনিক এবং ফসফরাসের মতো অত্যন্ত বিষাক্ত উপাদানের অবশিষ্টাংশ থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। সঙ্গে এই কেমিক্যালযুক্ত ফল নিয়মিত খেলে লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে।

এদিকে গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বাইডে পাকানো ফল খাওয়ার ফলে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং পুরুষদের উর্বরতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘমেয়াদি এক্সপোজারে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস এবং স্নায়বিক দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। কাঁচা লিচুতে থাকা উপাদান শিশুদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। তাই খালি পেটে অপরিপক্ক লিচু খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফল কেনার পর খাওয়ার আগে অন্তত ১-২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি বেকিং সোডা বা হালকা গরম পানিতে ধুয়ে নিলে কেমিক্যালের প্রভাব কিছুটা কমতে পারে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, ফলের মৌসুমের দু-এক মাস আগেই অসাধু কেমিক্যাল সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা মৌসুমের আগেই ফলে বিষ মাখিয়ে কাঁচা ফল পাকা দেখিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে। গত কয়েক বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রমাণও মিলেছে। ওই সময় এসব ফল বাজার থেকে ধ্বংসও করা হয়েছে। তাই ভোক্তাকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি তদারকি সংস্থার এই দিকে কঠোরভাবে নজর দিতে হবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, খাবারে বিষ বা কেমিক্যাল নিয়ে অন্য সংস্থা কাজ করে। আমরা বাজার তদারকি করি। যা চলমান আছে। বিশেষ করে ফলের বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অনিয়ম পেলে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।