Image description

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) শনাক্তের ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ না মেলায় বিভিন্ন সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছেন দেশের অসংখ্য নাগরিক। এনআইডি সার্ভারে একসময় আঙুলের ছাপ সংরক্ষণ করা হলেও পরে সেই ছাপ মিলছে না। বয়স বৃদ্ধি, চর্মরোগ, হাতের কাজ বেশি করতে হয় এমন শ্রমে আঙুলের রেখাগুলো নষ্ট হওয়ার কারণে এ সমস্যা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। এ ধরনের সমস্যার কারণে নির্বাচন কমিশন থেকে ভুক্তভোগীদের এ মর্মে প্রত্যয়ন বা এনওসি দেওয়া হচ্ছে যে আঙুলের ছাপ না মিললেও ডেটাবেইসে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এনআইডি নম্বরটি সচল রয়েছে।

গত বছরই নির্বাচন কমিশনের এনআইডি শাখা থেকে দুই হাজার ৭৮৮ জনকে এনওসি দেওয়া হয়েছে। এই এনওসি সংগ্রহেও নানা ভোগান্তি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এনওসি নিতে ভুক্তভোগীদের ঢাকায় নির্বাচন ভবনে আসতে হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এ সেবা মিলছে না।
 
আবার ওই এনওসিও কিছু ক্ষেত্রে কাজে লাগছে না।

মোবাইল ফোন সেবার ক্ষেত্রেও বিষয়টি বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মোবাইল ফোনের সিম সংগ্রহ করতে গ্রাহককে চারটি আঙুলের ছাপ দিয়ে তাঁর এনআইডি যাচাই করতে হয়। কিন্তু চার আঙুলের মধ্যে একটি আঙুলের ছাপ না মিললে তিনি সিম সংগ্রহ করতে পারেন না।

এই অবস্থায় গ্রাহককে পরামর্শ দেওয়া হয়, নির্বাচন ভবনে গিয়ে নতুন করে আঙুলের ছাপ দিয়ে আসতে। সে ক্ষেত্রে আঙুলের রেখা যাঁদের অস্পষ্ট হয়ে গেছে বা মুছে গেছে, তাঁদের ছাপ সংগ্রহ সম্ভব হয় না। এই অবস্থায় তাঁদের এনওসি দেওয়া হয়।

এ সমস্যা সম্পর্কে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) মহাসচিব লে কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মোবাইল সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় এনআইডি ভেরিফিকেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। ফলে আঙুলের ছাপের অসামঞ্জস্যতার কারণে এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে এনওসি প্রদান করলে অপারেটররা গ্রাহকদের সিম সরবরাহ করে থাকে। পাশাপাশি আঙুলের ছাপের বিকল্প বা সহায়কব্যবস্থা হিসেবে ফেস রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে সিম নিবন্ধন চালুর বিষয়টিও বর্তমানে পরীক্ষাধীন রয়েছে।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারীও বলেন, সমস্যাটি সমাধানের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। মোবাইল অপারেটররাও সমস্যার বিষয়টি জানিয়েছে। মোবাইল অপারেটররা যদি ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি চালু করতে পারে তাহলে আঙুলের ছাপের বদলে মুখমণ্ডল শনাক্তের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হতে পারে।

কিন্তু নির্বাচন কমিশনের এনআইডি শাখা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণের মাধ্যমে এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবেএমনটা মনে করছে না।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্র জানায়, এনআইডিতে আঙুলের ছাপ সমস্যাটি ১৫ বছর আগেই আলোচিত ছিল। ২০১১ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদের পাইলট প্রকল্পে এ সমস্যা চিহ্নিত হয়। নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার পত্নীতলা ইউনিয়ন ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভায় ভোটার তালিকা হালনাগাদের প্রথম দফা পাইলট প্রকল্পের কাজ শেষে এ কাজে সফলতার অন্যতম বাধা হিসেবে সঠিকভাবে সবার আঙুলের ছাপ পাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি চিহ্নিত হয়। প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন জানান, যাঁরা হাতে নিয়মিত মেহেদি লাগান অথবা রান্নার জন্য হলুদ বাটেন, তাঁদের আঙলের ছাপ সেভাবে পাওয়া যায় না। এ ছাড়া শ্রমজীবী যেসব মানুষকে হাতের কাজ বেশি করতে হয়, তাঁদের আঙুলের রেখাগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এই দুই ক্ষেত্রেই আঙুলের ছাপ নেওয়ায় সমস্যা হচ্ছে।  মোবাইল অপারেটরদের পক্ষেও জানানো হয়, ২০১৬ সালে বাধ্যতামূলকভাবে এনআইডি ব্যবহার করে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধনের সময় এই সমস্যাটি ব্যাপকভাবে নজরে আসে। কিন্তু এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান আজও হয়।

এনওসিতেও যে ক্ষেত্রে কাজ হচ্ছে না : মোহাম্মদ জাপান সিটি গার্ডেনের এক বাসিন্দা হাফিজুল ইসলাম জানান, জাতীয় সঞ্চয়পত্র কিনতে গিয়ে তিনি এই সমস্যায় পড়েন। হাফিজুল সঞ্চয়পত্রে তাঁর স্ত্রীকে নমিনি রাখতে চেয়েছিলেন। হাফিজুলের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরটি তাঁর স্ত্রী দীর্ঘদিন ব্যবহার করে আসছিলেন। সঞ্চয়পত্রের আবেদন ফরমে স্ত্রীর মোবাইল নম্বর হিসেবে সেই নম্বরটিই দেওয়া হয়। কিন্তু যাচাইয়ে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অফিস থেকে বলা হয়, নমিনির নিজের নামে মোবাইল নম্বর থাকতে হবে। এই অবস্থায় ওই নম্বরটি মালিকানা পরিবর্তন করতে গেলে হাফিজুলের স্ত্রীর আঙুলের ছাপের সমস্যাটি চিহ্নিত হয়। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি শাখা থেকে এনওসি আনলে সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর থেকে জানানো হয়, এনওসি দিয়ে নতুন সিম নেওয়া যাবে। তবে মালিকানা পরিবর্তন হবে না।

ভোগান্তি অনেকের : সম্প্রতি রাজশাহীর ষাটোর্ধ্ব হাসিবুল ইসলামের মোবাইল ফোনের সিম কার্ড হারিয়ে যায়। তিনি সংশ্লিষ্ট অপারেটরের গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যান ওই সিম সংগ্রহের জন্য। কিন্তু এনআইডির সার্ভারে থাকা আঙুলের ছাপের সঙ্গে বর্তমানের ছাপ মেলেনি। তাই নিজের নামে নিবন্ধন করা সিমটিও তিনি তুলতে পারেননি। বাধ্য হয়ে অসুস্থ শরীরে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) যান হাসিবুল। ইসির কর্মকর্তারা নতুনভাবে হাসিবুলের আঙুলের ছাপ নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেন না। তাই বিকল্প হিসেবে হাসিবুলকে এনওসি দেয় ইসি। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের সহকারী পরিচালক (সঠিকতা যাচাই) মুহা. সরওয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত প্রত্যায়নপত্রে উল্লেখ করা হয়, চর্মরোগ বা বয়স বৃদ্ধির কারণে হাসিবুল ইসলামের আঙুলের ছাপ নিম্নমানের। একাধিকবার চেষ্টা সত্ত্বেও আপডেট করা সম্ভব হয়নি। তবে, ডেটাবেইসে তাঁর এনআইডি নম্বরটি সঠিক এবং সচল রয়েছে।

হাসিবুল ইসলাম অসুস্থ থাকায় তাঁর ছেলে তিহান গত বৃহস্পতিবার প্রত্যয়নপত্রটি নিতে ইসিতে যান। তিহান কালের কণ্ঠকে বলেন, আঙুলের ছাপ না মেলায় যে ভোগান্তি পোহাতে হলো, এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের কয়েকবার ঢাকায় আসতে হয়েছে। এর একটি স্থায়ী সমাধান করা উচিত। আমার বাবার ছবি তো এনআইডিতে রয়েছে। সেটা মিলিয়েও তো সিম দিতে পারত। এ ছাড়া যাঁদের হাতই নেই, তাঁদের জন্য কী ব্যবস্থা হবে সেটাও স্পষ্ট করা দরকার।

শুধু হাসিবুল ইসলাম নয়, এমন ভুক্তভোগীর সংখ্যা অনেক। কেবল ২০২৫ সালে দুই হাজার ৭৮৮ জন ভোটারকে এ ধরনের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। এনআইডি অনুবিভাগের কর্মকর্তা মুহা. সরওয়ার হোসেন জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৪৭ জনকে এনওসি দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৯৫০ ও ফেব্রুয়ারিতে ৪২৯ জনকে এনওসি দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালেও অনেককে দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, গত ১৬ এপ্রিল ইসি সচিব আখতার আহমেদের সভাপতিত্বে মাসিক সমন্বয় সভায় সমস্যাটি আলোচনায় আসে। ওই সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, আঙুলের ছাপ পাওয়া যায় না এমন ব্যক্তিদের মোবাইল সিম ক্রয়ের ক্ষেত্রে এনওসি প্রদানের ক্ষমতা মাঠ পর্যায়ে ডেলিগেট করা যায় কি না, সে বিষয়ে পর্যালোচনা করে প্রস্তাব প্রস্তুত করতে হবে।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে স্মার্ট কার্ড বিতরণের সময় যাঁরা দশ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশের প্রতিচ্ছবি দিয়েছেন, চলতি বছরের ২৫ মার্চ পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে তিন কোটি সাড়ে ২৩ লাখের মতো ভোটারের আঙুলের ছাপ ও আইরিশ সার্ভারে আপলোড করা হয়েছে। আপলোড বাকি রয়েছে সোয়া কোটির মতো নাগরিকের তথ্য। এ ক্ষেত্রেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নাগরিকদের।

এনআইডি অনুবিভাগ যা বলছে : জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক (ডিজি) এ এইচ এম আনোয়ার পাশা এবং এই অনুবিভাগের সিস্টেম ম্যানেজার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন জানান, অন্যান্য সেবা ছাড়াও যেসব নাগরিক আয়কর রিটার্ন জমা দেন, তাঁদের ই-টিআইএন রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। তাতে ব্যক্তির এনআইডি দিয়ে নিবন্ধন করা সিম প্রয়োজন। যাঁদের ফিংগারপ্রিন্টের রেজ লাইনটা দুর্বল থাকায় কোনোভাবেই ক্যাপচার করা যায় না, তাঁদের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়। মূলত ২০২৪ সাল থেকে এ কাজে বেশি লোকজন আসছে ইসিতে।

মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন ফেস রিকগনিশনের বিষয়ে বলেন, এটি একটি জটিল কাজ। ফেস রিকগনিশনে এনআইডি যাচাই করা কঠিন। আঙুলের ছাপ ও আইরিশ নকল করার সুযোগ নেই। ফেস রিকগনিশনে হয়তো ৮০ শতাংশ সম্ভব। কিন্তু পুরোপুরি হবে না। আইরিশ আর ফিংগারপ্রিন্ট দিয়ে এটা শতভাগ সম্ভব।