পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড-আরইবির শহরভিত্তিক ২১টি সমিতির গরিব গ্রাহকের জন্য বিশেষ ট্যারিফ সুবিধা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি। আরইবির বিদ্যুতের দাম রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতোই বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পিডিবি। সরকারি এই সংস্থা জানিয়েছে, আরইবির ২১টি সমিতি দেশের অন্যান্য বিতরণ কোম্পানির মতো প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে ৯ দশমিক ৩৬ টাকায় বিক্রি করে। সমিতিগুলো লাভও করে বেশ। তাই ওই এলাকার গরিব গ্রাহকদের কোনো ভর্তুকি দেওয়ার দরকার নেই। গত সপ্তাহে পিডিবি গ্রাহক এবং বিতরণ কোম্পানির (বাল্ক পর্যায়ে) বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসিতে। সেখানে পিডিবি ২১ সমিতির জন্য বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন প্রস্তাব করেছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত গ্রাহকদের (লাইফ লাইন) বিশেষ ভর্তুকিমূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। পিডিবির বিদ্যুতের (বাল্ক পর্যায়ে) দামের সঙ্গে মূল্য সমন্বয় করতে ইতোমধ্যে দেশের সব বিতরণ কোম্পানির বিদ্যুতে দাম বাড়নোর প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে বিইআরসিতে। সেখানে গ্রাহকভেদে এক থেকে দেড় টাকা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে দেশের সব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি। এ নিয়ে ২০ ও ২১ মে গণশুনানির আয়োজন করেছে বিইআরসি। সরকার চাইছে বিদ্যুতের নতুন দাম জুন থেকে কার্যকর করতে। তবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ যুগান্তরকে বলেছেন, শুনানি শেষ হওয়ার পর বলা যাবে বিদ্যুতের নতুন দাম কবে থেকে কার্যকর হবে।
পিডিবির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আগে সাধারণ গ্রাহকরা ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত কমমূল্যের বিদ্যুৎ সুবিধা পেত। এখন পিডিবি শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ইউনিট ধরে নতুন দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। এতে কেউ ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত কম মূল্যের বিদ্যুতের ট্যারিফ সুবিধা পাবেন না। পিডিবি জানিয়েছে, শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ধরে ট্যারিফ নির্ধারণ করা গেলে সরকারের অতিরিক্ত আয় হবে ২ হাজার ৬৫৭ কোটি ১২ লাখ টাকা।
বাংলাদেশের জন্য উৎপাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় এবং বিতরণ কোম্পানির কাছে বিক্রির একমাত্র প্রতিষ্ঠান পিডিবি। সরকারি এই সংস্থা এখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৭ টাকায় বিক্রি করে। কিন্তু উৎপাদনকারীর কাছ থেকে কিনে বিতরণ কোম্পানিকে দিতে তার খরচ পড়ে প্রায় ১৩ টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে ১ লাখ ১৪ হাজার ২৪ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ দরকার হবে। এজন্য অর্থব্যয় হবে ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমান দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করলে পিডিবির আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। লোকসান হবে ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকার বেশি। তাই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো দরকার।
পিডিবি জানিয়েছে, পিডিবির কাছ থেকে কম দামে বিদ্যুৎ কিনে আরইবির প্রতি ইউনিটে ১ দশমিক ৯৪ টাকা, পিডিবির বিতরণ কোম্পানি ১ দশমিক ১০ টাকা, ডিপিডিসি ১ দশমিক ৪৭ টাকা, ডেসকো ১ দশমিক ৫০ টাকা, ওজোপাডিকো ১ দশমিক ৩১ টাকা এবং নেসকো ১ দশমিক ৮৩ টাকা লাভ করে।
পিডিবির হিসাব মতে, আরইবির সমিতি আছে ৮০টি। এর মধ্যে আরইবির সমিতি নরসিংদী ১, ২, নারায়ণগঞ্জ ১ ও ২, গাজীপুর ১ ও ২, ঢাকা ১, ২ ও ৪, মানিকগঞ্জ সমিতি, মুন্সিগঞ্জ সমীতি, চট্টগ্রাম-১ ও ৩, কক্সবাজার সমিতি, হবিগঞ্জ সমিতি, মৌলভীবাজার সমিতি, ময়মনসিংহ-১, কুমিল্লা-২ ও ৩, বাগেরহাট ও পটুয়াখালী সমিতি মূলত শিল্প এলাকাভিত্তিক। এই ২১টি সমিতি আরইবির মোট বিদ্যুতের ৪৫ শতাংশ ব্যবহার করে। পিডিবি বলছে, এই ২১টি সমিতির বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ দশমিক ৩৬ টাকা। আর বাকি ৫৯টি সমিতির বিদ্যুতের গড়মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ দশমিক ৮৫ টাকা। তাই এখানে (২১ সমিতিতে) কোনো ভর্তুকি না দিয়ে উৎপাদন মূল্য অনুযায়ী বা শহর এলাকার মতো ট্যারিফ নির্ধারণে প্রস্তাব করেছে পিডিবি। এ ছাড়া পিডিবি বিভিন্ন জেলার অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ব্যবসায়িক জোনে সিঙ্গেল পয়েন্ট মিটারিং, প্রতি ৬ মাস অন্তর বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের (মূলত বৃদ্ধি) প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে গ্যাসের সংকট। আমদানি করা এলএনজি এবং কয়লার ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। তাই বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়বে। বাড়বে বিদ্যুতে ভর্তুকির পরিমাণ। তাই আগামী বছরগুলোয় (মাল্টি ইয়ার ট্যারিফ) বিদ্যুতের দাম কী হবে, এর একটি পথনির্দেশনা থাকতে হবে। এটা করা গেলে গ্রাহক জানতে পারবে তার আগামী দিনের বিদ্যুতের মূল্য কী হবে। একই সঙ্গে ১৩২ কেভি বা এর চেয়ে বেশি ভোল্টেজ লেভেলের গ্রাহকদের সরাসরি পিডিবি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চায়। এটা করা না গেলে ১৩২ কেভি বা এর চেয়ে বেশি ভোল্টেজের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে ৪০ পয়সা ব্যবধান রেখে ট্যারিফ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
পিডিবির পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১২ দশমিক ৯১ টাকা নির্ধারণ করলে তাদের কোনো লোকসান হবে না। তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ দশমিক ২০ টাকা বাড়ালে অতিরিক্ত আয় হবে ১৩ হাজার ২৯৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর দেড় টাকা বাড়ালে রাজস্ব বাড়বে ১৬ হাজার ৬২২ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরে পিডিবি ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনবে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে। আর বর্তমান মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করলে তার আয় হবে ৭২ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। তারা বলছে, দাম না বাড়লে লোকসান হবে ৬২ হাজার ৯৬ কোটি টাকার বেশি।