একসময় বিকেলের মাঠ ছিল শহুরে শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কাটত শিশুদের সময়। এখন শহরে পর্যাপ্ত মাঠ নেই। অল্প কিছু মাঠ থাকলেও সেগুলো মাদকসেবী ও বখাটেদের দখলে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মাঠ এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। কিছু মাঠে শিশু পার্কের নামে নানা ধরনের যন্ত্র বসিয়ে ব্যবসা চলছে। আবার কিছু মাঠে সাপ্তাহিক বাজার বসিয়ে দেদার বাণিজ্য চলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক নগর পরিকল্পনায় খেলার মাঠ ও পার্ককে শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, বরং নগরের ‘ফুসফুস’ ও গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিজনের জন্য অন্তত ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা থাকা উচিত।
রাজউকের নতুন ড্যাপ (২০২২-৩৫) অনুযায়ী, দুই সিটিতে ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৭টিতে কোনো খেলার মাঠ বা পার্ক নেই। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীতে পার্কের জন্য এক হাজার ১৩৭ একর এবং খেলার মাঠের জন্য এক হাজার ৮৭৬ একর জমি থাকা দরকার। অথচ বাস্তবে পার্ক রয়েছে মাত্র ২৭১ একর এবং খেলার মাঠ ২৯৪ একর।
পার্ক ও খেলার মাঠের ভয়াবহ সংকটের চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণায়। এতে উল্লেখ রয়েছে, রাজধানীতে মোট ২৩৫টি খেলার মাঠ থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত মাত্র ৪২টি।
জানা গেছে, গত তিন দশকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় সবুজ অঞ্চল কমেছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। ১৯৯২ সালে যেখানে প্রায় অর্ধেক এলাকাজুড়ে সবুজ ছিল, ২০২২ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ১৬ শতাংশে। একই সময়ে বেড়েছে কংক্রিটের ধূসর নগরায়ণ, কমেছে জলাশয় ও গাছ লাগানোর খালি জমি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ৫৪টি ওয়ার্ডে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ১০৬টি পার্ক, খেলার মাঠ, ওয়াকওয়ে ও উন্মুক্ত গণপরিসর রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৩১টি সরাসরি ডিএনসিসির নিয়ন্ত্রণে। বাকিগুলো রাজউক, গণপূর্ত বিভাগ, আবাসন প্রকল্প কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ২৬টি মাঠ ও পার্ক উন্নয়ন প্রকল্প চলমান থাকলেও অন্তত ১০টি ওয়ার্ডে এখনো কার্যকর কোনো মাঠ বা পার্ক নেই।
বিআইপির নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বর্তমান জনসংখ্যার অনুপাতে শুধু ঢাকা উত্তরে আরো অন্তত ৬১০টি খেলার মাঠ প্রয়োজন। অথচ বর্তমান অবকাঠামো চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করছে। তাঁদের মতে, একটি বাসযোগ্য শহরে মোট ভূমির অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উন্মুক্ত সবুজ এলাকা থাকা উচিত। কিন্তু ঢাকার অনেক এলাকায় সেটি ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে।
এই সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন যুক্ত ওয়ার্ডগুলোতে খাসজমির স্বল্পতা, জমির মালিকানা জটিলতা এবং অনিয়ন্ত্রিত দখলের কারণে পরিকল্পিতভাবে পার্ক ও মাঠ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, শুধু পুষ্টিকর খাবার নয়, সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে শিশুদের নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তাও প্রয়োজন, আর খেলাধুলাই সেই স্বাভাবিক শরীরচর্চার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
তিনি বলেন, শহুরে পরিবেশে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়ায় শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। মাঠে খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা সামাজিক আচরণ, বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা ও হার-জিত মেনে নেওয়া শেখে। কিন্তু এখন তারা চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
ডা. তাজুল ইসলামের মতে, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে অভিভাবকদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি খেলাধুলা, সৃজনশীল কার্যক্রম ও পারিবারিক সময় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
‘এখানে ফুটবল খেলা নিষেধ’
কালের কণ্ঠের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর বনশ্রী, আফতাবনগর, বাড্ডা-রামপুরা, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, বছিলা ও ঢাকা উদ্যানের মতো দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকায় শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কোথাও মাঠ নেই, কোথাও মাঠ থাকলেও তা দখল, অব্যবস্থাপনা বা বাণিজ্যিক ব্যবহারে কার্যত অনুপযোগী।
বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠে সাইনবোর্ড টানিয়েই লিখে দেওয়া হয়েছে—এখানে ফুটবল খেলা নিষেধ। সরেজমিনে গেলে প্রবেশপথে বড় অক্ষরে লেখাটা চোখে পড়ে—‘এই ক্রিকেট মাঠে ফুটবল খেলা নিষেধ’। মাঠটি মূলত নির্দিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের জন্য সীমিত। প্রবেশ, পোশাক, হাঁটা কিংবা খেলার সময়, সবকিছুর জন্য রয়েছে কঠোর নিয়ম।
মাঠ ব্যবস্থাপনা কমিটি বলছে, মাঠটি ক্রিকেট উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে এবং দামি ঘাস রক্ষার জন্য ফুটবল খেলার সুযোগ দেওয়া হয় না। কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, কোনো পাবলিক স্পেস নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ হতে পারে না। জনসাধারণের মাঠে অতিরিক্ত বিধি-নিষেধ আরোপ আইন ও গণপরিসরের চেতনার পরিপন্থী।
এদিকে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত বনশ্রীতে প্রশস্ত সড়ক, ব্লকভিত্তিক আবাসন ও বাণিজ্যিক জোন থাকলেও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত মাঠ নেই। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, শুরুতে যেসব জায়গা ‘গ্রিন জোন’ বা উন্মুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারিত ছিল, সময়ের সঙ্গে সেগুলোর বড় অংশ ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় রূপ নিয়েছে। আজিজ পার্ক এলাকাটির পরিচিত উন্মুক্ত স্থান হলেও বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় তা অপ্রতুল।
লালমাটিয়ার ‘ডি’ ব্লকের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের শৈশব কেটেছে মাঠে খেলাধুলা করে। কিন্তু আমার ছেলের শৈশবের কথা ভাবলে কষ্ট হয়। আশপাশে হাঁটার জায়গা নেই, খেলার মাঠ নেই।’
‘ই’ ব্লকের বাসিন্দা ফারহানা হক বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় বিকেল মানেই মাঠ বুঝতাম। এখনকার বাচ্চারা বিকেল মানেই ইউটিউব আর টিকটক বোঝে।’
বাড্ডা-রামপুরায় সংকট আরো তীব্র। মেরুল বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, উত্তর ও দক্ষিণ বাড্ডা এবং রামপুরার বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার পরিবার বসবাস করলেও খেলার জায়গা সীমিত। ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকায় একটি মাঠ থাকলেও তা পুরো এলাকার চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।
প্রবীণ বাসিন্দা হাজি মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘আগে এখানে অনেক খোলা জায়গা ছিল। এখন চারদিকে শুধু ভবন। ডিআইটি প্রজেক্টে একটা মাঠ আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা পুরো বাড্ডা-রামপুরার জন্য যথেষ্ট নয়।’
রামপুরার বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, ‘নিচে নামলেই গাড়ি, মোটরসাইকেল আর রিকশার ভিড়। তাই বাধ্য হয়ে ছেলে মোবাইল ফোনে গেম খেলে।’
নতুন আবাসিক এলাকা ঢাকা উদ্যান ও বছিলা সিটি হাউজিংয়েও নেই খেলার মাঠ বা পার্ক। ঢাকা উদ্যানের বাসিন্দা শেখ তৌফিক বলেন, ‘আমার ছোট মেয়েকে নিয়ে হাঁটাহাঁটির জন্য কোথাও সুবিধা নেই।’
বছিলা সিটি হাউজিংয়ের বাসিন্দা অর্পিতা অমি বলেন, ‘এত বড় হাউজিং, কিন্তু কোথাও মাঠ কিংবা পার্ক নেই। মানুষ যে হাঁটবে, ভালোভাবে নিঃশ্বাস নেবে, সেই সুযোগও নেই।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কিছু মাঠ থাকলেও সেগুলোর অনেকগুলোই সাধারণ শিশুদের জন্য উন্মুক্ত নয়। বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠে প্রবেশ, পোশাক, খেলার ধরন ও সময় নিয়ে রয়েছে নানা বিধি-নিষেধ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক মাঠ কার্যত নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য সীমিত হয়ে গেছে।
অন্যদিকে মোহাম্মদপুর, বছিলা, আদাবর, কাটাসুর, ঢাকা উদ্যান, সিটি হাউজিংসহ বহু আবাসিক এলাকায় মাঠ বা পার্কই নেই। ফলে শিশুদের অনেকেই রাস্তায় খেলতে বাধ্য হচ্ছে। আবার নিরাপত্তার কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের বাইরে যেতে দিচ্ছে না। এতে মোবাইল ও অনলাইন গেমই হয়ে উঠছে শিশুদের প্রধান বিনোদন।
এই সংকট সামলাতে এখন বাড্ডা, রামপুরা ও বনশ্রীর বহু পরিবারের একমাত্র ভরসা হাতিরঝিল। প্রতিদিন বিকেলে সেখানে ভিড় করে শিশু-কিশোর থেকে বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত।
বনশ্রীর বাসিন্দা তানজিয়া শারমিন ইভা বলেন, ‘আমাদের এলাকায় কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাই বাচ্চাদের নিয়ে হাতিরঝিলেই আসতে হয়।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠ ও পার্কের এই সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রাক-স্কুল শিশু প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করে। শহুরে শিশুদের বড় অংশ দিনে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটায় এবং প্রায় ২৯ শতাংশ শিশুর আসক্তি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৯২ শতাংশ অভিভাবকই এর প্রধান কারণ হিসেবে খেলার জায়গার অভাবকে দায়ী করেছেন।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, যেসব অভিভাবক দিনে তিন ঘণ্টার বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, তাঁদের শিশুদের আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সমস্যার ঝুঁকিও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
বিআইজিডির ২০২৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও সামাজিক পরিবেশের অভাবে দেশের ৬০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী মানসিক চাপ ও বিষণ্নতায় ভুগছে। যেসব শিশু নিয়মিত খোলা মাঠে সময় কাটায় না, তাদের মধ্যে একাকিত্ব ও আত্মহত্যার চিন্তা তুলনামূলক বেশি। গবেষকদের মতে, মাঠের অভাব শিশুদের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক দক্ষতা ও বাস্তব জীবনের সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে।