বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানা চালুর জন্য বিশেষ সুবিধা দিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরুতে কারখানাগুলোকে সুবিধা দিতে স্বল্পমেয়াদি ৪০ হাজার কোটি টাকার রিফাইন্যান্স স্কিম করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নীতিগত পলিসি তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাবে। পরে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির ভিত্তিতে সার্কুলার জারি করা হবে।
বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য সামনে রেখে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আবার উৎপাদনে ফিরবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি এ বিষয়ে ২০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিজনেস ও ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সঙ্গে মতবিনিময়সভা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সভায় বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল করতে দ্রুত ও কার্যকর অর্থায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
সভা সূত্রে জানা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক আছে, শুধু ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন করতে পারছে না, তাদের জন্য স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলের বকেয়ার কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, যন্ত্রপাতি নষ্ট এবং ক্রেতা (বায়ার) নেই, তাদের জন্য মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন দেওয়া হবে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং নতুন করে যন্ত্রপাতি স্থাপন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা দেওয়া হবে।
তবে ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে অর্থায়ন বাস্তবায়নের জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টিসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে।
সভায় উপস্থিত একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় দুই ডজন ব্যাংকে লুটপাট হয়েছে এবং এসব অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে এই খাতে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা সীমিত। তাই জরুরি তহবিল সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই সরবরাহ করা প্রয়োজন। যদিও এসব অর্থ বিতরণ করবে ব্যাংকগুলোই। এ কারণে তারা ক্রেডিট গ্যারান্টি চাইছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা আরো জানান, করোনাকালে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করেছিল ব্যাংকগুলো। কিন্তু প্যাকেজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ সমন্বয় করে নিলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে এখনো পুরো অর্থ আদায় করা যায়নি। ফলে নতুন করে ঝুঁকি নিতে তারা অনিচ্ছুক।
জানা গেছে, বন্ধ কলকারখানা সচল করতে গত ২৬ এপ্রিল ১৯ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিভাবে অর্থায়ন করা যায়, সে বিষয়ে কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গতকাল ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সভা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানও দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সভায় বন্ধ কারখানা সচল করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। গত ২৫ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সভার পর তিনি বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো আবার চালু করতে শিগগিরই একটি প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আমরা প্রতিটি ব্যাংকের কাছ থেকে বন্ধ কারখানার তালিকা সংগ্রহ করছি। কারণ আমরা দেখতে চাই, কারখানাগুলো ঠিক কী কারণে বন্ধ হয়েছে। এগুলো বিশ্লেষণ করে সরকারের সঙ্গে বসব। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, কী ধরনের সুবিধা দিলে কারখানাগুলো আবার চালু করা যায়। এক মাসের মধ্যেই এই উদ্যোগ সামনে আসবে।’