দীর্ঘ ১৫ বছর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শাসন ক্ষমতায় ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এবার আর পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেন না। বিধানসভা নির্বাচনে গেরুয়া ঢেউয়ে ভেঙে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের দেড় দশকের ক্ষমতার কাঠামো।
সোমবার (৪ মে) ভোট গণনা চলতে থাকলেও সন্ধ্যা নাগাদ প্রবণতা স্পষ্ট—‘দিদি’র শাসনের অবসান ঘনিয়ে আসছে। কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের দিকে এগিয়ে রয়েছে।
এই অগ্রগতি শুধু আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্বল হয়ে পড়া এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমন্বয় নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তনের চেয়ে বিদ্যমান নীতির ধারাবাহিকতাই আপাতত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পরিবর্তন খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়। তার ভাষায়, সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপির শক্ত অবস্থান আগেই দৃশ্যমান ছিল। কংগ্রেস বা স্থানীয় দলগুলোর বিচ্ছিন্ন সাফল্য সত্ত্বেও সামগ্রিক ফলাফল অনেকটাই পূর্বানুমেয়।
এই পরিবর্তনের ফলে ভারতের কেন্দ্রীয় নীতিতে তাৎক্ষণিক বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। বিদ্যমান নীতিগুলোই অব্যাহত থাকতে পারে, যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও একটি স্থিতিশীল ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।— সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ
মুন্সি ফয়েজ আহমদ মনে করেন, এই পরিবর্তনের ফলে ভারতের কেন্দ্রীয় নীতিতে তাৎক্ষণিক বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। বিদ্যমান নীতিগুলোই অব্যাহত থাকতে পারে, যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও একটি স্থিতিশীল ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।
তিনি বলেন, দিল্লির বর্তমান সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের কার্যকর যোগাযোগ এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে, যদিও তা এখনো পুরোপুরি পরিণত নয়। ফলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্কের কাঠামো ভেঙে পড়ার শঙ্কা নেই।
এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কেন্দ্র ও রাজ্যে একই রাজনৈতিক দলের সরকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি নীতিনির্ধারণে সমন্বয় বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুতে নতুন গতি আসতে পারে। অতীতে এই চুক্তি মূলত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে আটকে ছিল। ফলে রাজনৈতিক সমন্বয় বাড়লে আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে কূটনীতিকরা সতর্ক করে বলছেন, পূর্বের আলোচনার জায়গা থেকে সরাসরি অগ্রগতি সম্ভব নয়। নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন হবে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় দেড় দশক ধরে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। ২০১১ সালে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় মমতার আপত্তির কারণেই চুক্তিটি আর স্বাক্ষরের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে বাংলাদেশে এই ইস্যুতেই তাকে বেশি করে চেনা হয়।
ভারতের নির্বাচনি রাজনীতিতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ প্রায়ই উঠে আসে, বিশেষ করে ‘অনুপ্রবেশ’ বা অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে। নির্বাচনের সময় এসব বক্তব্য আরও তীব্র হয়।
মুন্সি ফয়েজ আহমদ মনে করেন, এসব বক্তব্যের বড় অংশই রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত। বাস্তবে বাংলাদেশ থেকে বড় ধরনের ‘রিফিউজি ঢল’-এর কোনো প্রমাণ নেই।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মূলত ঢাকা ও দিল্লির মধ্যেই নির্ধারিত হয়, কোনো রাজ্য সরকারের মাধ্যমে নয়। কেন্দ্রীয় সরকার যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে তাদেরকে রাজ্য পর্যায়ের বক্তব্য ও আচরণের দিকেও নজর রাখতে হবে।— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসিন
তবে এই ধরনের রাজনৈতিক বয়ান সীমান্তে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ‘পুশব্যাক’ বা জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর মতো উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে— যা অতীতেও দেখা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসিনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদিও রাজনৈতিক বক্তব্যে উত্তেজনা তৈরি হয়, বাস্তবে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কলকাতার স্বাস্থ্যসেবা, খুচরা ব্যবসা এবং শিক্ষা খাতের একটি বড় অংশ বাংলাদেশি গ্রাহকদের ওপর নির্ভরশীল।
একইভাবে বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দুই দেশের বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। সীমান্ত বাণিজ্য, পরিবহন ও সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে উভয় অর্থনীতিই পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল।
এই বাস্তবতা রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও দুই দেশকে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে বাধ্য করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস জাগো নিউজকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পর থেকেই রাজ্যে দলটির প্রভাব ধীরে ধীরে বেড়েছে।
একসময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করা এই কূটনীতিক বলেন, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়সহ ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিজেপির বিস্তার এই প্রবণতাকে আরও দৃঢ় করেছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের এই পরিবর্তন বৃহত্তর একটি জাতীয় প্রবণতার অংশ।
তার মতে, এবার না হলেও ভবিষ্যতের কোনো নির্বাচনে এই পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা আগেই ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মূলত ঢাকা ও দিল্লির মধ্যেই নির্ধারিত হয়, কোনো রাজ্য সরকারের মাধ্যমে নয়।
অধ্যাপক আমেনা মহসিন জাগো নিউজকে বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে তাদেরকে রাজ্য পর্যায়ের বক্তব্য ও আচরণের দিকেও নজর রাখতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, নাগরিকত্ব প্রমাণের জটিলতা থাকায় ‘পুশব্যাক’ ইস্যু সহজেই কূটনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও একটি আশ্বস্তকারী অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
তার মতে, বাংলাদেশ নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও এই সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে।