দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তিন ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে পে-স্কেল সংক্রান্ত পুনর্গঠিত কমিটি তাদের সুপারিশ তৈরির কাজ শুরু করেছে। শিগ্গিরই তা সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে। অর্থনীতির চাপ কমাতে কমিটি আগামী তিন বছরে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে। এতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল বেতনের ৫০ ভাগ দেওয়া হতে পারে। এজন্য নতুন বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে বরাদ্দ ৩৫-৪০ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করবে অর্থ বিভাগ। এতে প্রথম বছরেই সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য করা পে-স্কেলের ৩৩ ভাগ বাস্তবায়ন করা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
জানা যায়, প্রথম বছর শেষে পরের দুই অর্থবছরে বাকি অর্ধেক মূল বেতন এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পে-স্কেল সংক্রান্ত পুনর্গঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে কোনো কিছু চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে কমিটির সবাই ঘোষিত পে-স্কেল বাস্তবায়নের পক্ষে। কারণ, এ বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের চাপ রয়েছে। চলতি বাজেটে পে-স্কেল বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থ এ খাতে ব্যবহার করা হয়নি। তিনি জানান, নতুন বাজেটে এ খাতে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বার্ষিক বৈঠক শেষে উজবেকিস্তান থেকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশে ফেরার পর পুনর্গঠিত কমিটি পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন। পে-স্কেলের বিষয়ে কোনোকিছু চূড়ান্ত হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও এ নিয়ে বৈঠক করবেন অর্থমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে অর্থের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অর্থ বিভাগ এ খাতে কত বরাদ্দ দিতে পারবে, সেটি আগে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় বড় অঙ্কের ঘাটতি বাজেট করা হচ্ছে। এখন মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি। পে-স্কেলের ঘোষণা এলে বাজারে এর প্রভাব পড়বে, তা বিবেচনায় নিয়ে তিন থেকে চার ধাপে এটি বাস্তবায়ন হতে পারে। এজন্য অর্থ বিভাগের সঙ্গে কমিটিকে একাধিক বৈঠক করার পরামর্শ দেন সরকারের সাবেক এই সচিব।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, পে-স্কেলের আংশিক আগামী অর্থবছরেই বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। ১০ বছরে প্রতিবছর ৫ শতাংশ বেতন বাড়লেও মূল্যস্ফীতি এর চেয়ে বেশি হয়েছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কষ্ট বেড়েছে।
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। তখন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বর্তমান ব্যয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রয়োজন হতে পারে আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। বেসামরিক কর্মচারীদের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও বেতন কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। তিনটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের সুপারিশ তৈরির জন্য বিএনপি সরকার গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। এ কমিটিই তিন ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে। এতে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। তবে গ্রেড রাখা হয়েছে আগের মতো ২০টি। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮, যা আগে ছিল ১:৯ দশমিক ৪। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব ও সিনিয়র সচিবদের জন্য ২০ ধাপের বাইরে আলাদা ধাপ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে, যা নিয়ে পরে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি হবে।
এছাড়া পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পেলে তা প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশন হলে বৃদ্ধি হতে পারে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনের ক্ষেত্রে বাড়তে পারে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত। ৭৫ বছরের বেশি বয়সিদের জন্য ১০ হাজার, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সিদের জন্য ৮ হাজার এবং ৫৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য ৫ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার প্রস্তাব রয়েছে।