আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর শর্ত থাকলেও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনায় ১ লাখ ৫ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা বেশি। সবচেয়ে বেশি ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। অন্যদিকে খাদ্যে ভর্তুকি চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৬১৪ কোটি টাকা কমিয়ে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রণোদনায়। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স আহরণ বাড়াতে এ খাতে প্রণোদনা বাবদ ৮০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বর্তমানে বৈধপথে (ব্যাংকিং চ্যানেলে) রেমিট্যান্স পাঠালে ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে এই প্রণোদনার হার ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
ভর্তুকি বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি বাজেটের সমপর্যায়ের। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই বরাদ্দের বাইরেও অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন দেখা দেবে বলে আশঙ্কা অর্থ বিভাগের। এছাড়া অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এই বাড়তি চাপের মূল কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, তাহলে সরকারের প্রাক্কলিত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাস খাতেও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। আগামী বাজেটে এ খাতে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এলএনজি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই খাতেও সরকারের আর্থিক দায় বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি গ্যাস আমদানিকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে, যা শেষ পর্যন্ত ভর্তুকির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি ব্যয় কমানোর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত থাকলেও চলমান সংকট মোকাবিলায় সেই জায়গা থেকে সরে এসেছে সরকার। সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া, উৎপাদন বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রাখা হবে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে আইএমএফের ঋণ সহায়তা পাওয়া নিয়ে সরকারের সঙ্গে সংস্থাটির এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে। এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ভর্তুকি বৃদ্ধির প্রবণতা আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর, বিশেষ করে আইএমএফের আপত্তি রয়েছে। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই ভর্তুকি কমিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের ওপর জোর দিয়ে আসছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নিু ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখা এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা এসব কারণে সরকার ভর্তুকি পুরোপুরি কমাতে পারছে না।
কৃষি খাতে বড় বরাদ্দ অব্যাহত থাকলেও খাদ্যে ভর্তুকি কমছে : খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখছে সরকার। সারে ভর্তুকির জন্য প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি খাতে এই বড় বরাদ্দের কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে-উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে সার ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। প্রস্তাবিত বাজেটে খাদ্যে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৬১৪ কোটি টাকা কম। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তবে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৫৫১ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১০ হাজার ২১৪ কোটি টাকার ভর্তুকি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে আসন্ন বাজেটে খাদ্য ভর্তুকি কমানো হলেও শেষ পর্যন্ত তা কতটুকু বহাল রাখা যাবে সেটি বিবেচনার বিষয়। ইতোমধ্যে হাওড়ের ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ওই অঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তা এবার হুমকির মুখে পড়তে পারে। সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভর্তুকি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। এ কারণে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
রেমিট্যান্স প্রণোদনায় বাড়ছে ৮০০ কোটি টাকা : হুন্ডি প্রতিরোধ ও বৈধপথে রেমিট্যান্স আনতে আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসীদের জন্য নগদ প্রণোদনা ও অন্যান্য সুবিধা অব্যাহত রাখা হবে। রেমিট্যান্স পাঠানোর বিপরীতে সরকার এখন ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে। এই হার আগামী বাজেটে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি নিজস্ব তহবিল থেকে অতিরিক্ত প্রণোদনা দিচ্ছে। গত বছরের তুলনায় রেমিট্যান্সে প্রায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।