Image description

ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নন সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ-সদস্যরা। তাদের নেই নির্দিষ্ট সংসদীয় এলাকাও। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একজন সংসদ-সদস্য এবং সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সদস্যের ভূমিকা এবং কাজেরও রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। অনেক সময় দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব যেমন স্পষ্ট হয়েছে; তেমনি রয়েছে নানা বঞ্চনা এবং বৈষম্যের অভিযোগও। বিশ্লেষকদের চোখে বিষয়টা অনেকটা এমন, ‘যেন সম্মান থাকলেও নেই ক্ষমতা’।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদে আইনপ্রণেতা হিসাবে একজন নির্বাচিত সংসদ-সদস্যের সমান অধিকার থাকে একজন সংরক্ষিত আসনের সদস্যের। সংসদে বিল উত্থাপন, বাজেট আলোচনা এবং ভোট দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা যেমন তাদের রয়েছে, তেমনি বেতন-ভাতাসহ সব অধিকার একজন সাধারণ সংসদ-সদস্যের মতোই তারা সমানভাবে পান। তবে নির্দিষ্ট নির্বাচনি এলাকা না থাকায় কাজের ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। ভোটারদের মাধ্যমে নির্বাচিত না হয়ে দলীয় হাইকমান্ডের আনুগত্য কিংবা পছন্দে নারী আসনের সদস্য হওয়ায় মাঠপর্যায়ে তাদের দায়বদ্ধতা কম বলে আলোচনা রয়েছে।

এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের জন্য কার্যালয় না থাকায় তাদের কাছে সাধারণ মানুষের যোগাযোগও কঠিন হয়ে পড়ে। তৃণমূলে কাজ করতে গেলে অনেক সময় সরাসরি নির্বাচিত সংসদ-সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের সদস্যের মধ্যে সমন্বয়হীনতা কিংবা দ্বন্দ্বের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে নানা সময়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, কোনো এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ বা টিআর-কাবিখাসহ সরকারি অনুদান বণ্টনের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা তেমন গুরুত্ব পান না। আবার কেউ কেউ নিজ এলাকার প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠেন, যা সরাসরি নির্বাচিত সংসদ-সদস্যের সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিতে অতীতে দেখা গেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরেই নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের বদলে সরাসরি নির্বাচনের কথা বলা হলেও গুরুত্ব দেয়নি কোনো সরকারই। সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচিত সংসদ-সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ-সদস্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারা দুজনই পূর্ণাঙ্গ সংসদ-সদস্য এবং সুযোগ-সুবিধাও এক। কিন্তু ক্ষমতার বলয়, প্রভাব, ভারসাম্য এবং দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে দুজনের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। তারা আরও বলেন, এই বৈষম্যের মূলে রয়েছে নির্দিষ্ট সংসদীয় এলাকা না থাকা। এক্ষেত্রে সাধারণত সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের কয়েকটি এলাকার উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা। সাধারণত জেলার ভিত্তিতে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। কখনো কখনো সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যকে সর্বোচ্চ দুটি জেলার দায়িত্ব দেওয়ারও নজির রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ওই এলাকায় ভোটে নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের প্রভাব থাকায় তাদের ভূমিকাটা বেশির ভাগ সময়ই অগুরুত্বপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।

সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদ-সদস্য হয়েও সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা সেভাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। তারা বলছেন, সংসদে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নেওয়া এই বিশেষ পদক্ষেপ বাস্তবে নারীকে খুব একটা ক্ষমতায়িত করতে পারেনি। বিশেষ করে এখন পর্যন্ত যে কজন নারী নেতৃত্ব সংরক্ষিত আসনের সংসদ-সদস্য থেকে পরবর্তীতে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসতে পেরেছেন সেটি বিবেচনা করলেই এর জবাব মিলবে।

রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথের পর পুরনো সেই আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হলেও এর মধ্য দিয়ে তাদের ক্ষমতায়িত করার যে উদ্যোগ, তা আদৌ বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা। কারণ সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের কার্যপরিধি বা তাদের দায়িত্বের বিষয়ে সংবিধানে আলাদাভাবে কিছু উল্লেখ নেই। সংবিধানে শুধু বলা আছে, সংসদে সংরক্ষিত আসন থাকতে হবে। সেটির সংখ্যা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন করা হলেও তাদের কার্যপরিধির বিষয়ে আলাদাভাবে কিছু বলা নেই।

রোববার রাত ৯টার দিকে সংসদ ভবনের পূর্ব ব্লকের লেভেল-১ এ অবস্থিত শপথকক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান ছাড়াও বিএনপি এবং জামায়াতের সংসদ-সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এই শপথের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ পূর্র্ণাঙ্গ রূপ পেল।

এর আগে বৃহস্পতিবার সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ৪৯ জন সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গেজেটে বিএনপির ৩৬ জন, জামায়াত জোটের ১২ জন এবং স্বতন্ত্র ১ জন সংসদ সদস্যের নাম ও ঠিকানা উল্লেখ আছে। ৫০টি আসনে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য গত ২১ এপ্রিল ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। এই সময়ের মধ্যে ৫৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। বাছাইয়ে বাদ পড়েন চারজন।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ১৯৭২ সালে যখন এই আইনটি তৈরি করা হয় তখনকার প্রেক্ষাপটে তা ছিল যুক্তিসঙ্গত ও সময়োপযোগী। নারীর ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সেসময় এই আইন তৈরি করা হয়েছিল। তখন নারীরা তুলনামূলকভাবে ঘর থেকে কম বের হতেন এবং নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তেমন সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল না। কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই সংরক্ষিত আসনের ভূমিকা অনেকটাই অকার্যকর। শুধু তাই নয়, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন না।

তিনি আরও বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট সংরক্ষিত আসন থেকে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে নারীদের আসন যেন নিতান্তই আলংকারিক পদে পরিণত না হয়। নারীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ না দিলে নির্বাচনি এলাকার প্রতি তার জবাবদিহিতা যেমন তৈরি হবে না, তেমনি নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যও বাস্তবায়ন হবে না।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের নারীদের পশ্চাৎপদ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সংবিধানের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতার অঙ্গীকার করা হয়েছে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে, যা মোট আসনের মাত্র ১৪ শতাংশ। এই পদ্ধতিতে নারী আসনের সদস্যদের খুব একটা করণীয় থাকে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রভাবের কাছে তাদের হার মানতে হয়।

তিনি বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রসারিত করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে আসন সংখ্যা ১০০ তে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়। কমিশন প্রতি তিনটি সংসদীয় আসন নিয়ে নারীদের জন্য একটি আসন সৃষ্টি এবং সেসব আসন থেকে নারীদের সরাসরিভাবে নির্বাচিত হওয়ার প্রস্তাব করে। এ পদ্ধতিতে নারীদের আসন নির্ধারিত থাকবে এবং প্রতিবার নারীরা একই আসন থেকে অন্য নারীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এটি বাস্তবায়িত হলে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে।