সরকারি-বেসরকারি নানা পদক্ষেপ, সচেতনা বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার পরও থামছে না অবৈধ পথে মালয়েশিয়া গমন। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ধারদেনা করে দালালকে টাকা দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ পাড়ি দিচ্ছেন উত্তাল সাগর। কখনো আবার বৈধ পথে যাওয়ার প্রতারণায় আরেক দেশে নিয়ে আটকে রেখে করা হচ্ছে নির্যাতন। রয়েছে চিরদিনের মতো পরিবারের কাছে না ফেরারও অনেক গল্প। আবার স্বপ্ন বোনার আগেই ঋণের বোঝায় নীরবে শেষ হয়ে যাচ্ছে শত শত পরিবার। আর এই অবৈধ পথে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন রুট, কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড।
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের সর্বশেষ সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা আগাম ভিসা ছাড়া বর্তমানে বিশ্বের ৩৬টি দেশ ভ্রমণ করতে পারবে। এর মধ্যে কম্বোডিয়াও আছে। মাত্র ৩০-৩৬ ডলার খরচ করেই অনলাইনে সহজেই অনএরাইভাল ই-ভিসা বা ইলেকট্রনিক ভিসা নেয়া যায়। মাত্র ৩৬শ’ টাকার এই ট্যুরিস্ট ভিসায় কমপক্ষে ৩০ দিন পর্যন্ত থাকা যায় কম্বোডিয়ায়। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে কিছু অসাধু দালাল চক্র। যাদের সঙ্গে যুক্ত আছে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের আরেকটি চক্র। এমনই এক ভুক্তভোগী চাঁদপুরের সাইফুল সরকার। তিনি বলেন, এই চক্রের প্রথম ধাপের সদস্যদের টার্গেট থাকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে প্রলোভন দিয়ে রাজি করা ও টাকা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো। এরপর ভ্রমণের কথা উল্লেখ করে ই-ভিসা নিয়ে ফ্লাইটে করে কম্বোডিয়ায় পাঠানো। কম্বোডিয়া বিমানবন্দরে নামার পর সেখানে অপেক্ষা করে চক্রের আরেকটি পক্ষ। যারা বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে কম্বোডিয়া থেকে থাইল্যান্ডের দুর্গম সীমান্তে নিয়ে যায়। নিরাপত্তা প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখান থেকে নেয়া হয় থ্যাইলান্ডে। সেখান থেকে আবার কাভার্ডভ্যান বা মালবাহী ট্রাকে করে নেয়া হয় সমুদ্র তীরবর্তী বাসাবাড়ি, হোটেল বা রিসোর্টে। সেখান থেকে মাছধরা নৌকায় জেলে সাজিয়ে তুলে দেয়া হয়। আবার কাউকে গাড়িতে চাপিয়ে সড়ক পথে নেয়া হয় মালয়েশিয়ায়। তবে অনেক দালাল চক্র আবার থাইল্যান্ডের জঙ্গলে নিয়ে অত্যাচার করে অতিরিক্ত টাকা পাঠানোর জন্য দেশে ফোন দিতে বাধ্য করে। টাকা না পেলে হত্যা করে লাশ মাটিচাপা দেয়ার অভিযোগও মিলেছে।
সম্প্রতি থাইল্যান্ডের সমুদ্র তীরবর্তী একটি রিসোর্ট থেকে নারীসহ মোট ২২ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করে সেই দেশের পুলিশ। যাদের থাইল্যান্ডের খুয়ান মীদ থানায় হস্তান্তর করা হয়। এর আগে গত ৮ই এপ্রিল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সংখলা প্রদেশের চানার নাথাব উপজেলায় অবস্থিত ওই রিসোর্টটিতে অভিযান চালায় থাইল্যান্ডের অভিবাসন বিভাগ ও পর্যটন পুলিশ। ওই সময় বন্ধ রিসোর্টটির ভেতর থেকে বিদেশি ভাষার কথাবার্তার শব্দ শুনতে পান কর্মকর্তারা। পরে একটি পরিত্যক্ত ভবনের প্রবেশপথে টাঙ্গানো ত্রিপোল সরিয়ে তারা একটি সরু পথ খুঁজে পান, যা একটি অন্ধকার কক্ষে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে গাদাগাদি অবস্থায় বসে থাকা ২২ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করে তারা। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি পুরুষ। তাদেরকে বাইরে আনার পর, তারা সবার আগে তাদের মোবাইল ফোনগুলো ফেরত চান। বলেন, তাদের ফোনগুলো রিসোর্টের মালিক কেড়ে নিয়েছে। পুলিশ তখন ৬৬ বছর বয়সী ওই রিসোর্ট মালিক কৃতিদেতের ঘরের বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখা দু’টি ছোট বাক্স থেকে ১৬টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করে। ওই সময় দোভাষীর মাধ্যমে ওই বাঙালিরা বলেন, তারা প্রত্যেকে দালালদের প্রায় ৭ লাখ টাকা করে দিয়েছেন মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য। তারা বাংলাদেশ থেকে কম্বোডিয়ায় বিমানে চেপে গিয়েছেন। এরপর ৪ঠা এপ্রিল সাকায়েও প্রদেশ দিয়ে পায়ে হেঁটে থাইল্যান্ডে প্রবেশ করেছেন। সেখানে দুইদিন একটি হোটেলে রাখার পর ধাপে ধাপে তাদের সরানো হয়। সবশেষ ৮ই এপ্রিল ভোর ৫টার দিকে একটি কাভার্ডভ্যানে করে তাদের ওই রিসোর্টে আনা হয়। ভ্যানের চালক রিসোর্ট মালিকের সঙ্গে কথা বলে তাদের সকলকে পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে রাখে। সেখান থেকে মাছ ধরার নৌকায় ও ভ্যানে তাদের নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল মালয়েশিয়া।
এর আগে গত ১৯শে মার্চ থাই কর্তৃপক্ষ ১৬ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেছে, যারা মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে পাচারের অপেক্ষায় দক্ষিণাঞ্চলীয় সংখালা প্রদেশের হাত ইয়াইয়ের একটি ভাড়া বাড়িতে তিনদিন ধরে খাবার ও পানি ছাড়া তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। অভিযান চালানো থাই সীমান্ত টহল পুলিশ, অভিবাসন কর্মকর্তা, থুং লুং পুলিশ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে বাড়িটির সামনের দরজা তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। তারা পেছন দিক দিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকে তারা একটি ছোট ঘরে ১৬ জন পুরুষকে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় বসে থাকতে দেখেন। কর্মকর্তাদের দেখে আটক থাকা ওই মানুষগুলো খাবারের জন্য আকুতি জানায় এবং কর্তৃপক্ষকে বলে যে, তাদের তিনদিন ধরে খাবার ও পানি ছাড়া সেখানে আটকে রাখা হয়েছে। পরে দোভাষীর মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিবাসীপ্রত্যাশীরা পুলিশকে জানায়, তারা সকলেই বাংলাদেশ থেকে ফুকেটে এসেছেন। ফুকেট থেকে সংখালায় পিকআপ ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়ার আগে তাদের সকলের হাতে লাল সুতো বেঁধে দেয়া হয়। তাদের সবার গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া।
মো. সবুজ শেখ নামে এক মালয়েশিয়ান প্রবাসী বলেন, বর্তমানে অবৈধভাবে ক্লান্তান হয়ে থাইল্যান্ড সীমান্ত দিয়ে গাড়িতে করে সরাসরি মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করছে অনেকে। আর এই তালিকায় আমাদের বাংলাদেশিরাও রয়েছে। গত ১৯শে এপ্রিলও ওই বর্ডার দিয়ে প্রবেশের সময় ৩টি গাড়ি আটক করে মালয়েশিয়া পুলিশ। সেখান থেকে বাংলাদেশিসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। তিনি বলেন, এই সবকিছুর পেছনে বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ারও লোক জড়িত রয়েছে। কখনো কখনো এই দেশে থাকা বাঙালিরাও এই চক্রের হয়ে কাজ করেন। গত ১৮ই জানুয়ারি ‘আসরাফ গ্যাং’ নামে পরিচিত একটি অবৈধ অভিবাসী পাচারকারী চক্রকে গ্রেপ্তার করে মালয়েশিয়া পুলিশ। আটক ওই চক্রের হোতা আসরাফ ও আবু দু’জনই বাংলাদেশি।
এদিকে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে গত সপ্তাহে আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২৫০ জন।
মানব পাচার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা ফিল্মস ফর পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ সিদ্দিকী বলেন, মানব পাচারের একটি বড় কারণ হলো দেশের বেকারত্ব বৃদ্ধি। এ ছাড়া প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তারাও এসব দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। দালালরা মূলত অসহায় শ্রেণির দরিদ্র পরিবারের বেকার ও অভাবী মানুষগুলোকে টার্গেট করে থাকে। বিশাল অঙ্কের বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়েই এই ফাঁদে ফেলে তাদের। মানব পাচারের এই বিশাল নেটওয়ার্ককে ভাঙতে সরকারি ও বেসরকারি পদক্ষেপের সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফরম) শরিফুল হাসান বলেন, মূলত আমাদের দেশের যারা অবৈধ পথে মালয়েশিয়া বা অন্যান্য দেশে যাচ্ছেন তাদের এই যাত্রা কোনটা বৈধ বা কোনটা অবৈধ- সে সম্পর্কে তাদের খুব এটা বেশি ধারণা নেই। তারা শুধু জানেন, সেখানে গেলেই হয়তো তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের এই অবৈধ যাত্রার শেষ গন্তব্য হয় মৃত্যু, না হয় জেল। আর যদি কেউ পৌঁছেও যান, সে তো সেখানে বৈধভাবে কাজও করতে পারবেন না, টাকাও পাঠাতে পারবেন না। তাই এই মাইগ্রেশনের বিষয়ে আমাদের দেশের সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ যেসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা রয়েছে তাদের এই বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। সাধারণ মানুষের মাঝে এই বিষয়ে সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সম্মিলিতভাবে প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি করতে হবে।