একের পর এক জাল সনদধারী ধরা পড়ছে তদন্তে। তাদের পেছনে খরচ হয়েছে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা। যে টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। সবশেষ তথ্যানুযায়ী বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোট ১ হাজার ৬৪৯ জন শিক্ষকের তথ্য পেয়েছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। যাদের কাছে সরকারের পাওনা মোট ৮৩৪ কোটি টাকা। সবশেষ ৪৭১ জন শিক্ষক-কর্মচারীর তালিকা দেয়া হয়।
জাল সনদে চাকরি করা তিনজনের সঙ্গে কথা হয়। যাদের দু’জন ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়েছেন। চিহ্নিত দু’জনের একজন চাকরি করেন জামালপুরে। তিনি বলেন, আমি এই প্রতিষ্ঠানেই কর্মরত ছিলাম। এরপর এমপিওভুক্ত হওয়ার সুযোগ আসে। নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নেয়া হয়নি। এনটিআরসিএতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। অফিসের বাইরে ঘোরাঘুরি করতো নানান ধরনের দালাল। আকাশ নামে একজনের সঙ্গে তিন ধাপে পাঁচ লাখ টাকার চুক্তি করি। তিনি এক শিক্ষক চাকরি পাওয়া সত্ত্বেও যোগ দেননি। প্রথম ধাপে এক লাখ টাকা নিয়ে ওই ব্যক্তির কাগজপত্র যেগুলো পরবর্তীতে যাচাই হয় না সেগুলো সংগ্রহ করে দেন। এরপর যাচাই হওয়া কাগজপত্রের জন্য (মূলত নিবন্ধন সনদ) এরজন্য তিন লাখ টাকা নেন। আর যাচাইয়ের সময় কোনো সমস্যা হবে না- এই মর্মে যাচাইয়ের পরে আরও এক লাখ টাকা নেন। তিনি আরও বলেন, যার নামে আমি চাকরি করছি তাকে আমি চিনিও না। যতদুর জানি তিনিও জানেন না তার নিবন্ধন দিয়ে আমি চাকরি করছি। তিনি দাবি করেন- যাতে মানবিক কারণে তাদের চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়া না হয়। প্রয়োজনে আমাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পুনরায় বৈধ হওয়ার সুযোগ করার জোর দাবি জানাই।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষক বলেন, চাকরিতে প্রবেশের আগেই একটি দালাল চক্রের মাধ্যমে জাল সনদ জোগাড় করি। তারা একটা স্যাম্পল আমাকে প্রথমে পাঠায়। আমাকে জানানো হয়- ব্ল্যাকলিস্টের মাধ্যমে নাম ইনক্লুড করা হবে। ৬ লাখ টাকা দাবি করা হয়। কাজের আগে এক লাখ যোগদানের পর পাঁচ লাখ। তিনি বলেন, তারা খুবই সুপরিকল্পিত। বাইরের একজন যোগাযোগ করেন। আর কারও নাম বা পরিচয় বলেন না। তাদের প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটা সিন্ডিকেট আছে। যারা পুরো কাজটা করতো।
আরেক শিক্ষক বলেন, আমি নিবন্ধনে উত্তীর্ণ হই। কিন্তু আমার পছন্দের প্রতিষ্ঠানের জন্য আমার কয়েক মার্ক বেশি দরকার ছিল। এরপর আমি সনদে ৪ নম্বর বাড়িয়ে জমা দেই। আমি প্রথমে কোনো দালালের সহযোগিতা নেইনি শুধুমাত্র নিবন্ধন কপিটি এডিট করে জমা দেই। পরে দালালের মাধ্যমে এনটিআরসিএ’র সার্ভারে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে নম্বর বাড়িয়ে নেই।
এই তিন শিক্ষকই জাল সনদ সংগ্রহ করেন কয়েক বছর আগে। তাদের সঙ্গে এই চক্রের আর যোগাযোগ নেই। প্রথম দুইজন শিক্ষক প্রায় ১০ বছর চাকরি করার পর তদন্তে ধরা পড়েছেন। তিনজনের কাছে জানতে চাইলে বলেন, সিন্ডিকেটের হোতা ধরতে গেলে এনটিআরসিএ’র সামনে তদারকি করতে হবে। কারণ অফিসে কেউ সরাসরি দুর্নীতি করে না। আর অপরাধী ধরতে চাইলে নিয়োগের সময় যারা এনটিআরসিএ’তে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করতে হবে। ডিআইএ’র তথ্যানুযায়ী যেসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করেছেন বা অনলাইনে তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে তাদেরকেই মূলত আইডেন্টিফাই করা সহজ হচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে, এই তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। সীমিত জনবলের কারণে তারা কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন না বলেও জানান।
২০১২ সাল থেকে এই কাজ করছে ডিআইএ। এর আগে ২০২৩ সালের শুরুতে স্কুল-কলেজের ৬৭৮ জন এবং কারিগরি ও মাদ্রাসার প্রায় ২০০ জন জাল সনদধারীর তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল সংস্থাটি। সে সময় মন্ত্রণালয় জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে মামলাসহ একাধিক ব্যবস্থা নিয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয়ের ঐ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অনেকে শিক্ষক উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কারণেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি সরকার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ডিআইএ’র পাঠানো জাল সনদধারীদের তালিকাগুলো মাউশিতে পাঠানো হয়। বেতন-ভাতা সংগ্রহের নির্দেশনা দেয়া হয়। সুপারিশ করা হয় এসব শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইএ পরিচালক প্রফেসর এমএম সহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা এই কার্যক্রম আরও জোরালো করতে চাই। যদিও আমাদের লোকবল সংকট রয়েছে। জাল সনদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের জমি বেহাত হওয়ার বিষয়টিও আমাদের নজরে রয়েছে।