রাজশাহীর দুর্গাপুরে সেকেন্দার আলী নামে এক ব্যক্তির ওপর বিএনপি নেতাকর্মীরা বর্বরোচিত নির্যাতন চালিয়েছেন। দলীয় কার্যালয়ে আটকে রেখে রড ও হাতুড়ি দিয়ে তাকে পৈশাচিক কায়দায় দফায় দফায় নির্যাতন করা হয়। চাঁদার দাবিতে এ নির্যাতনের খবর পেয়ে ৯ কিলোমিটার দূর থেকে এসে দুই ঘণ্টা পর থানাপুলিশ তাকে সংকটাপন্ন অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে স্বজনরা তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করেন।
গত ৫ এপ্রিল রাত আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত দুর্গাপুরের সুখানদিঘি ক্লিনিক মোড়ে এ নির্মম ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় নির্যাতনের শিকার সেকেন্দার আলীর স্ত্রী পলি খাতুন দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব জোবায়েদ হোসেনসহ ১৩ জন দলীয় নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে থানায় এজাহার দায়ের করেছেন। মামলায় আরও চার-পাঁচজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
আহত সেকেন্দার গত ৯ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে ফেরার পর বিএনপি নেতাকর্মীরা তার বাড়িতে আবারও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছেন। মামলার আসামি হলেও উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব জোবায়েদ হোসেনসহ নেতাকর্মীরা গত ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের গ্রেফতার করছে না পুলিশ।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুর্গাপুর থানার এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, গ্রেফতারের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলবেন। আমরা নির্যাতিত সেকেন্দারকে সঙ্গে নিয়ে আসামি ধরার জন্য অভিযান চালিয়েছি। ইতোমধ্যে মামলাটি রেকর্ড হয়েছে। নির্যাতিত সেকেন্দারের অভিযোগ, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে চলেছেন প্রভাবশালী বিএনপি নেতা জোবায়েদ এবং তার অনুসারীরা। ফলে আতঙ্ক এবং আবারও হামলার আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা।
আহত সেকেন্দারের স্ত্রী পলি খাতুন মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, এক ও দুই নম্বর আসামি ইলিয়াস উল ইসলাম লাকী ও জুয়েল আপন দুই ভাই। তাদের সঙ্গে পূর্ববিরোধ রয়েছে। এ বিরোধের জের ধরে ৫ এপ্রিল রাত আটটার দিকে জয়নগর ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়ে তার স্বামী সেকেন্দারকে বন্দি করেন আসামিরা। এরপর বরেন্দ্র প্রকল্পের টিউবওয়েলের জন্য দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তার স্বামীকে হাত-পা বেঁধে মাটিতে ফেলে পুরো শরীরে লোহার রড এবং হাতুড়ি দিয়ে মারতে থাকেন। দুই ঘণ্টার টানা অকথ্য নির্যাতনে তার স্বামী অজ্ঞান হয়ে যান। তিনি খবর পেয়ে সেখানে গেলে আসামিরা গালাগাল করেন এবং স্বামীর কাছে যেতে বাধা দেন। এ সময় মামলার তিন নম্বর আসামি জোবায়েদ সব বিষয় তদারকি করছিলেন। এ হামলায় তার আপন দুই ভাইসহ অনুগত বিএনপি নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এরপর তার স্বামীর বড় ভাই আয়নাল হক ৯৯৯-এ ফোন দেন। রাত দশটার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সেকেন্দারকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নির্যাতিত সেকেন্দার বলেন, ‘আমার ওপর হামলার একপর্যায়ে আমি জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। এলাকার মানুষজন ভেবেছিলেন, আমি মারা গেছি। তাদের রড এবং হাতুড়ির আঘাতে আমার বুক ও ডানহাতের হাড় ভেঙে গেছে। হাত ও পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। ফুলে গেছে। মাথায় আঘাত রয়েছে। চলাফেরা করতে পারছি না। চার দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর বাড়ি এসেছি। বাড়ি ফেরার পর আসামিরা আবারও হামলা চালিয়েছে। বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি নেতা জোবায়েদসহ সবাই আমার প্রতিবেশী। একই গ্রামে বাড়ি। মামলার প্রধান আসামি লাকী আওয়ামী লীগ সমর্থক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে আমার ৯টি পুকুর এবং ৫৬ লাখ টাকা জোরপূর্বক কেড়ে নিয়েছে। আমি বিএনপিকর্মী। বিএনপি নেতা প্রয়াত আব্দুল মজিদ সরদারের সমর্থক। পুকুর এবং টাকা ফেরত চাওয়ার কারণে লাকী অনৈতিক সুবিধা দিয়ে জোবায়েদকে নিজের পক্ষে নিয়েছে। আর জোবায়েদের লাঠিয়াল বাহিনী আমার ওপর হামলা চালিয়েছে। তারা আমাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে।’
নববর্ষের অনুষ্ঠানে পুলিশের সামনেই একজন আসামি কীভাবে অংশ নেন-এ প্রশ্নের জবাবে দুর্গাপুর থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি যখন ছিলাম তখন আসামিদের দেখিনি। এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলতে পারবেন। রাজনৈতিকভাবে কেউ ক্ষমতাবান হলেও আইনের চোখে সবাই সমান।
অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব জোবায়েদ হোসেন বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে হেনস্তার উদ্দেশ্যে মামলাটিতে আমাকে আসামি করা হয়েছে। আমি ২০ বছর ধরে গ্রামে থাকি না। ঘটনার দিন রাজশাহীতে ছিলাম। সেকেন্দারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি করেন। গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মারধর করেছে। কারও নামে মামলা হলেই তিনি দোষী নন। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্বে থাকার কারণে আমাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতে হয়।’