কয়লা ও তেল সংকটের কারণে বাড়ছে লোডশেডিং। গরম বাড়তে না বাড়তেই দুর্দশা চরমে উঠেছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। লোডশেডিংয়ের বড় ধাক্কা লেগেছে ঢাকার বাইরে। গ্রামগঞ্জে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, যা মানুষের জন্য অসহ্যের। লোডশেডিংয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল কেনার টাকা দিতে পারছে না। এদিকে রামপাল ২ নম্বর ইউনিটও হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সব মিলে এবার গরম শুরু হতে না হতেই ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং বকেয়া পাওনার কারণে এবার কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের বড় ধরনের মজুতের উদ্যোগ কম। এমন অবস্থায় মে মাসের গরমে লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এদিকে পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের কাছে ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা আছে। এই টাকা না দিলে এবারের গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ দেওয়া কঠিন হবে।
বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ চলছে এখন। গ্রীষ্মের খরতাপ স্বাভাবিক জীবনকে অসহনীয় করে তুলছে। বেড়েছে এসি এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ব্যবহার। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পিডিবিকে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মোগওয়াট। আর তখন উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৩২৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। তবে বিকাল ৫টায় তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ায় সেই লোডশেডিং ৯০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে।
পিডিবি জানিয়েছে, আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। এ ধরনের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র-বাঁশখালীর ১৩২০ মেগাওয়াটের এসএস পাওয়ার এবং মাতারবাড়ী ১৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র। কয়লা না থাকায় এসএস পাওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট। আর মাতারবাড়ীর উৎপাদন ১৫০ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে, আরএনপিএল-এর ১২০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনক্ষমতা থাকলেও ৪০০ মেগাওয়াটের মতো উৎপাদন করছে। এসএস পাওয়ারের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবাদত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, পিডিবির কাছে এসএস পাওয়ারের ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা আছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর কয়লাবোঝাই জাহাজের ভাড়া প্রতি টনে ৮-১০ ডলার বেড়েছে। সরকার সেই ভাড়া দিতে চাইছে না জানিয়ে তিনি বলেন, এখন কয়লা আনা মানে লোকসান করা। তাই ভাড়া ঠিক করলে কয়লা আনা হবে। তিনি আরও বলেন, এখন তাদের প্ল্যান্টে মাত্র ১ হাজার ৬০০ টন কয়লা আছে।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) কেএমএম রেসালত রাজীব বলেন, সাধারণত কয়লা আমদানি হয় ইন্দোনেশিয়া থেকে। এ বছর ওই দেশের সরকার কয়লা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির ইস্যু তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে মার্চের পর কয়লা পাওয়া যায়নি। তাই পুরো উৎপাদন করতে পারছে না মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র।
জানা যায়, ১৬ এপ্রিল ৬০ হাজার টনের একটি কয়লার জাহাজ মাতারবাড়ীতে এসেছে। আজ থেকে মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, মাতারবাড়ী কেন্দ্রে বিদ্যুৎ বিল বাকি ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে দেড় কোটি টন কয়লা ব্যবহার হয়। যার সবটুকুই আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে। তবে দেশটির সরকার এক সিদ্ধান্তে জানিয়েছে, আগের বছরের (২০২৫) চেয়ে এ বছর বিভিন্ন খনি থেকে ২৪ শতাংশ কয়লা কম তোলা হবে। ২০২৫ সালে দেশটি কয়লা উত্তোলন করেছিল ৭৯ কোটি টন। সেখানে এই বছর করা হবে ৬০ কোটি টন। পিডিবি জানিয়েছে, দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা হচ্ছে (আদানি ছাড়া) ৬ হাজার ২০৩ মেগাওয়াট। বুধবার দুপুর ১টায় উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৬৫৭ মেগাওয়াট।
কয়লার বাইরে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও দুশ্চিন্তা সংশ্লিষ্টদের। এ কেন্দ্রগুলো (ফার্নেস অয়েল) উৎপাদনক্ষমতা ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট। বুধবার এগুলো উৎপাদন করেছে ১ হাজার ৭২১ মেগাওয়াটের মতো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বকেয়া বিল এবং বিশ্ববাজারে ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধির কারণে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ৩০টির মতো ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র সরকারের কাছে বিদ্যুৎ বিল পায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত যুগান্তরকে বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা আইপিপিগুলো এখন তেল আমদানি করতে পারছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ঠিকমতো ব্যাংকের কিস্তি দিতে পারেনি। কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার মতো অবস্থা নেই অনেকের। অনেকে ফার্নেস অয়েল আমদানির এলসি করতে পারছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে সামনে আরও লোডশেডিং বাড়বে।
জানা যায়, আইপিপিগুলোর ফার্নেস অয়েল মজুতের ক্ষমতা ৩ লাখ ৬০ হাজার টনের মতো। কিন্তু এখন তাদের কাছে তেল আছে মাত্র ১ লাখ ৪২ হাজার টন। বিপ্পার মহাসচিব কর্নেল (অব.) এআর মোহাম্মদ পারভেজ মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, পরিস্থিতি ভালো না। অনেকটা রেশনিং করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে তেলভিত্তিক আইপিপিগুলো। আইপিপির কাছে যে তেল আছে, তা দিয়ে এই এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। কিন্তু এরপর কী হবে। তিনি বলেন, সরকার টাকা দিলেও এলসি খুলে তেল আমদানি করতে কমপক্ষে ৪০ দিন লাগবে। ততদিনে গরমে মানুষের কষ্ট অনেক বাড়বে। তিনি জানান, এ বছরের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে জুলাই পর্যন্ত রেকর্ড গরম পড়তে পারে। সেই প্রস্তুতি সরকারের থাকা দরকার।
পিডিবি জানিয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির কাছে এ মুহূর্তে ১ লাখ ৯২ হাজার টন ফার্নেস অয়েল মজুত আছে। সেই তেল দিয়ে ১৫-১৬ দিন তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো যাবে। তবে পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে ফার্নেস অয়েলের প্রতি টন ৪০০ ডলার থেকে এক লাফে ৮০০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। দেশে ফার্নেস অয়েলের দাম প্রতি লিটার ৭৫ থেকে বেড়ে ৯৪ দশমিক ৬৯ টাকা হয়েছে। তাই তেলভিত্তিক বিদ্যুতের দাম অনেক বাড়বে। আগে প্রতি ইউনিট খরচ হতো ২০ টাকার মতো। এখন তা বেড়ে হবে ২৬ টাকা। এতে বাড়বে পিডিবির লোকসান। গত অর্থবছরে পিডিবি ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও লোকসান করেছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। এবার তা অনেক বাড়বে। কারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিট ১২ টাকার বেশি হলেও পিডিবি বিক্রি করছে ৮ টাকার কমে।
গ্রামে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং : রাজধানী ঢাকার বাইরে কয়েকদিন ধরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের লোহাগড়ার বটতলী স্টেশন থেকে আহসানুল হক ইমন যুগান্তরকে বলেন, চাহিদামতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। গরমে কখনো কখনো টানা লোডশেডিং হচ্ছে। এতে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে বৃদ্ধ এবং শিশুরা। ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ের একই অভিযোগ করেছেন কুমিল্লা, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা।