Image description
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ) দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে সরকারের ওপর নানা ভাবে চাপ সৃষ্টি করবে বিরোধী দলগুলো।

সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের পর উপজেলা ও পৌরসভাতে যাতে বিএনপিদলীয় নেতাকর্মীদের প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ না দেয়, সেই দাবিও জোরালো করবে। বিরোধী দলগুলো মনে করছে, প্রশাসক নিয়োগের নামে দলীয় নেতাদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগাম কৌশল নিয়েছে সরকারি দল।

এজন্যই নির্বাচন দেরিতে আয়োজন করতে চায় বিএনপি। ওই চাপ সৃষ্টির অংশ হিসাবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত সারা দেশে ঘোষিত কর্মসূচিতে তেল ও সার সংকটের কথা সামনে আনবে ১১ দলীয় জোট। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত দেওয়ার ওপরও জোর দেবে। একই সঙ্গে নিজেদের প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও পৃথকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, বিরোধী জোটের আন্দোলনে সতর্ক দৃষ্টি রাখলেও এই মুহূর্তে বড় আকারে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ভোটের চিন্তা করছে না সরকার। তবে বিরোধীদের পালটা চাপে রাখতে সরকার ছোট আকারে কিছুসংখ্যক ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় ভোট আয়োজন করার চিন্তা করছে।

ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সারা দেশের নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশনের তথ্য সংগ্রহ করেছে। কারণ হিসাবে দলটির নেতারা জানান, সামনে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা। এরপরই বর্ষা মৌসুম।

এসব বিবেচনায় বছরের শেষ দিকে বড় আকারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় সরকার। সম্প্রতি সংসদ ভবন থেকে বের হওয়ার সময় স্থানীয় সরকার, পল্নী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণ প্রতীকে নির্বাচনের দিকে যাব।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরাও দ্রুত নির্বাচন চাই। তবে সামনে বাজেট আছে। সংসদ অধিবেশন চলছে। আছে চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি। এসব কারণে দেশে নানা ধরনের বৈরী পরিবেশ বিরাজ করছে। ফলে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আমরা দ্রুত নির্বাচনের দিকে যাব। পাশাপাশি বিরোধী দল নন-ইস্যুকে ইস্যু তৈরির যে চেষ্টা করছে সেটিকে আমরা রাজপথে মোকাবিলা করব।’

এদিকে ভোট আয়োজনের সময়সীমা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পালটাপালটি চাপ ও বক্তব্য থাকলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। সেখানে নির্বাচনি আমেজ বইতে শুরু করেছে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে নানা ভাবে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন।

শহর থেকে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। সড়ক-মহাসড়কের পাশে নানা রঙের বিলবোর্ডও দেখা যাচ্ছে। মনোনয়ন বা সমর্থন পেতে লবিং-তদবিরও শুরু করেছেন অনেকেই। কোনো কোনো দল ভিন্ন কৌশলও নিয়েছে। চট্টগ্রামে গিয়ে সাবেক মেয়র মনজুর আলমের সঙ্গে সংসদ-সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর দেখা করার বিষয়টি টক অব দ্য কান্ট্রি। এই ঘটনা স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

তবে ইসি সূত্র জানিয়েছে, ভোট আয়োজনে নির্বাচন কমিশন এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। মালামাল কেনাসহ কিছু কিছু কাজ এগিয়ে রাখছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষা করছে। ইতোমধ্যে নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে জাতীয় সংসদে যেসব বিল পাশ হয়েছে, সেগুলোর কপি এখনো পায়নি ইসি। এ কারণে নির্বাচন বিধিমালা সংশোধনের কাজ শুরু করেনি।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনপ্রতিনিধি নেই বা নির্বাচন উপযোগী, সেই তথ্য নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনি কিছু মালামাল আমরা আগেই কিনে রেখেছি। কোন প্রতিষ্ঠানে কবে থেকে ভোটগ্রহণ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই বিষয়গুলো নিয়ে উল্লেখযোগ্য আলোচনা বা সিদ্ধান্ত কোনোটি হয়নি।

দীর্ঘদিন অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কারণে সাধারণ মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

জানতে চাইলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীম যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনের বদলে সরকারকে প্রশাসক নিয়োগ করতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এটা দেশের জন্য ভালো নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে গিয়ে নানা কারণে সমালোচিত হয়, সে কারণে বিএনপি ওই রকম কোনো পরিস্থিতির শিকার হতে চায় না। এজন্য প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে তারা কিছুটা সময় নিচ্ছে। মূলত বিএনপি দেশের হালচাল বুঝতে চায়, প্রশাসন ও পুলিশের অবস্থান বুঝতে চায়। এছাড়া ইতোমধ্যে যেহেতু কিছু প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে, সেগুলোতে তাদের কাজ করার সুযোগও দিতে চাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

সরকারকে চাপে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী দল : সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন আয়োজন করতে আইনি কোনো বাধা দেখছে না বিরোধী দল। তারা দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে সরকারকে চাপে রাখার কৌশলকে বেশি করে কাজে লাগাবে। পাশাপাশি নিজেদের জোর প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকারগুলো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে।

এটা সংবিধানে আছে। যারা এত বেশি সংবিধান মানে, তারা ক্ষমতায় গিয়ে আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিচ্ছে না। বরং তারা সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদসহ সর্বত্র দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে। তিনি বলেন, প্রশাসক তো আগেই ছিল। তাদের সরিয়ে সরকার তাদের দলীয় লোক নিয়োগ দিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা মূলত প্রশাসনকে নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করছে। অথচ এ যাবতকাল বিএনপি এই দলীয়করণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। দুর্ভাগ্য, এখন তারাই সেই কাজ করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিএনপি যে এতজন প্রশাসক নিয়োগ দিল সেখানে কী দলের বাইরে আর কোনো যোগ্য লোক খুঁজে পাওয়া গেল না।

এক প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি। আমাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করা আছে। স্থানীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে নাকি একক প্রার্থী দেওয়া হবে-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন যার যার দলীয় অবস্থান থেকে সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক। তবে নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা হলে আমরা ১১ দল বসে আলাপ-আলোচনা করে একক প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করব।

অপরদিকে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব যুগান্তরকে বলেন, গণভোটের রায় অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির ওপর মানুষের আস্থা চলে গেছে। মানুষ মনে করে, তারা এখনই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিতে চায় না। তিনি বলেন, আমরা দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। সংস্কারের দাবিতে ১১ দলীয় জোটের যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, সেসব কর্মসূচিতে তেল ও সার সংকটের মতো জনদুর্ভোগের বিষয়টি তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন দ্রুত দেওয়ার দাবি তোলা হবে।

এ বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে একেবারে মাঠপর্যায়ের কাউন্সিলর, মেম্বার প্রার্থী বাছাই করছি। আমরা বেশ কয়েক মাস ধরেই দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে আমাদের (এনসিপির) সংসদ-সদস্যরাও এ নিয়ে ব্যাপক কাজ করছেন। আমরা ৫টি সিটি করপোরেশনের প্রার্থী ঘোষণা করেছি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা সর্বোচ্চ ভালো করতে যা যা করণীয় তা করছি। শুধু এনসিপির প্রার্থী নয়, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বঞ্চিত জনপ্রিয় নেতাদেরও আমরা আহ্বান করছি প্রার্থী হওয়ার জন্য। আমরা ইতিবাচক সাড়াও পাচ্ছি।

সতর্ক অবস্থানে সরকারি দল : বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, বিরোধী দলের কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে দলটি। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন নিয়ে যেন পরিস্থিতি ঘোলাটে না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনিয়ম, কেন্দ্র দখলের মতো কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে দলীয় সংসদ-সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বিএনপির সংসদীয় কমিটির সভায় এ নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এজন্য দলীয় সংসদ-সদস্যদের কাজ করতে হবে।