জাতীয় মহাসড়কগুলো বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে ভয়াবহ সব সড়ক দুর্ঘটনা, অকালে ঝরছে শত শত প্রাণ। সড়ক নিরাপত্তা আইন ও সচেতনতার অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং বেপরোয়া গতির কারণে জাতীয় মহাসড়কগুলো যেন এখন পরিণত হয়েছে এক একটি ‘মৃত্যুর ফাঁদ’। গত পাঁচ বছরেই সড়কে ঝরেছে ৩৫ হাজার ১৭৪ জনের প্রাণ। পঙ্গুত্বসহ আহত হয়েছেন ৫৯ হাজার ৯৮৫ জন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ের তুলনায় বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল-এই পাঁচ বছরের ব্যবধানে জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনা বেড়েছে ৩৪ শতাংশ, আঞ্চলিক সড়কে প্রায় ৭২ শতাংশ। আর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়েছে ১৭ শতাংশ, আহত ১২০ শতাংশ। এসব মৃত্যুর কারণ যেসব দুর্ঘটনা সেগুলোর ৩৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে। আর ৩৭ শতাংশ ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এর মধ্যে বাস, ট্রাক এবং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি। হতাহতদের একটি বড় অংশই কর্মক্ষম তরুণ বা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাতীয় মহাসড়কে বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, সিএনজি, অটোরিকশা, নছিমন, করিমন চলাচল এবং অবকাঠামোগত ত্রুটিই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। দীর্ঘদিন ধরেই এসব সমস্যা চিহ্নিত হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়ে গেছে। তাদের মতে, এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আইন প্রয়োগে জোরদার করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে হবে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। এতে যে ছবি ফুটে ওঠে তা অনেকটা এরকম-এই সময়ে সারা দেশে মোট দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে ৩৩ হাজার ৬২২টি। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩৫ হাজার ১৭৪ জন। আর আহত হয়েছে আরও অন্তত ৫৯ হাজার ৯৮৫ জন। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে জাতীয় মহাসড়কে সংঘটিত হয়েছে ১২ হাজার ৩৮টি, আঞ্চলিক সড়কে ১২ হাজার ৩৬৩টি, গ্রামীণ সড়কে ৫ হাজার ৭০টি এবং শহরের সড়কে ৩ হাজার ৮০৮টি। জাতীয় মহাসড়ক কেন দুর্ঘটনার মহাকেন্দ্রে পরিণত হলো এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি মনে করছেন, দুর্ঘটনার সব ঝুঁকি বিদ্যমান রেখেই মহাসড়কে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে গতি বাড়ানোর আয়োজন করা হয়েছে।
হাদিউজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মূল্যায়ন ছাড়া বিনিয়োগ করলে যা হওয়ার ছিল, এটাই হচ্ছে। মহাসড়কে গতি বেড়েছে, কিন্তু চালকের প্রশিক্ষণ বাড়েনি। এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে, দুই লেনের সড়ক চার লেন হচ্ছে। পানির নিচে, মাটির ওপরে বিশাল বিশাল স্থাপনা হচ্ছে-কিন্তু সেসব সড়কে চলার মতো উপযুক্ত যানবাহন আসছে না। উল্টো জাতীয় মহাসড়কে রিকশা চলছে। অর্থাৎ দুর্ঘটনার জন্য সম্ভাব্য যত ধরনের ঝুঁকি থাকে সব বজায় রেখে মহাসড়কে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছি। কিন্তু ব্যবস্থাপনায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারিনি। তাই দুর্ঘটনা ও মৃত্যু কমছে না।’
দুর্ঘটনার পেছনের কারণ বলতে গিয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানাচ্ছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; বেপরোয়া গতি; অতিরিক্ত ওজন বহন; চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা; চালকদের বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; তরুণ-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অন্যতম।