Image description

দেশের ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের বৈপরীত্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে ব্যাংকগুলোতে রেকর্ড পরিমাণ অতিরিক্ত তারল্য জমা হচ্ছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। ফলে শিল্প ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তারা তীব্র অর্থসংকটে পড়ছেন।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণও ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে এ সময় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা আগে ছিল ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। বিপরীতে আমানত প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। মতিঝিল ডিসিসিসিআইয়ের এক গোলটেবিল বৈঠকেও এসব তথ্য উঠে আসে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়াতে ঋণ বিতরণ না করে তারল্য ধরে রাখছে। একই সময়ে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে সরকার ব্যাংক থেকে নিয়েছে ৭৩ হাজার ৩৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৯ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৬৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাংকগুলোর ওপর খেলাপি ঋণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫ সালের শেষে মোট খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ২ শতাংশে। বিশেষ করে ৫০ কোটি টাকার বেশি বড় ঋণে ইচ্ছাকৃত খেলাপির হার বেড়ে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

এ ছাড়া ২৩টি ব্যাংকে প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি রয়েছে। খাতটির মোট মূলধন পর্যাপ্ততা হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি কমাতে কঠোর ঋণনীতি অনুসরণ করছে। ফলে নতুন ঋণ বিতরণ ধীর হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ঋণ সংকোচনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প ও সিএসএমই খাতে। তথ্য অনুযায়ী, শিল্প খাতে টার্ম লোন পুনরুদ্ধার প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। মোট বকেয়া শিল্প ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া উচ্চ সুদের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে আসছেন। নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশ হলেও কার্যকর ঋণ সুদ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চ সুদ, কঠোর শর্ত এবং জামানতের অভাবে তারা ব্যাংক ঋণ পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকিং খাত এখন এক ধরনের দুষ্টচক্রে আটকে গেছে। খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়া কমাচ্ছে। ফলে ব্যবসা কার্যক্রম কমে যাচ্ছে, যা আবার ঋণ পরিশোধে বাধা সৃষ্টি করছে। এতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়ছে এবং ঋণ সংকোচন আরও তীব্র হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে ডিসিসিআই বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে এবং বেসরকারি ব্যাংকের ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ, অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সুদের হার কমানো, ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা, সম্প্রসারণ ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে তারল্যের অভাব নেই, তবে আস্থারসংকট ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা কাটাতে কার্যকর সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে।