২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। এক-এগারো ষড়যন্ত্রের অন্যতম কুশীলব কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রিমান্ডে এনে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম সাবেক সেনা গোয়েন্দাপ্রধান মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। মামুন খালেদকে তিন দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান যে এক-এগারো ষড়যন্ত্রের মাস্টারমাইন্ড দুই সম্পাদক ও সুশীল সমাজের কিছু লোক। গত ২৫ মার্চ রাতে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
পর দিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্দিক আজাদ এ মামলায় তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
৩১ মার্চ দ্বিতীয় দফায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তাঁর ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দ্বিতীয় দফার রিমান্ড শেষে ৬ এপ্রিল তাঁকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তৃতীয় দফায় তাঁকে চার দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্দিক আজাদ তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন, রিমান্ডে মামুন খালেদ এক-এগারো ষড়যন্ত্রের মূলহোতাদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। রিমান্ডে তাঁর কাছে মূলত জানতে চাওয়া হয়-কেন, কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এক-এগারো সংঘটিত করে? উত্তরে মামুন খালেদ জানিয়েছিলেন, সুশীল সমাজের একটি অংশের ষড়যন্ত্রের ফসল ছিল এক-এগারো। এই সুশীল সমাজ বাংলাদেশে একটি অনির্বাচিত সরকারকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ধরনা দেয়। তাদের একাংশের তৎপরতায় বাংলাদেশে সৃষ্টি করা হয় ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা। একই সঙ্গে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি বিতর্কিত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হয়। মামুন খালেদ দাবি করেন, এক-এগারো ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সেনাবাহিনী যুক্ত হয়েছে শেষ পর্যায়ে। তাঁর মতে শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যাবে, এ বার্তা পাওয়ার পরই সশস্ত্র বাহিনী এক-এগারো ষড়যন্ত্রের অংশ হয়। রিমান্ডে মামুন দাবি করেন যে সশস্ত্র বাহিনী এক-এগারো পরিকল্পনার অংশ ছিল না। বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছিল।
তদন্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক ডিজিএফআইয়ের প্রধান জানান, এক-এগারোর মূল পরিকল্পনাকারী ছিল সুশীল সমাজের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দুটি সংবাদপত্র। এ দুই পত্রিকা অনির্বাচিত সরকারকে কীভাবে ক্ষমতায় আনা যায়, কীভাবে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে বিতর্কিত এবং নিষ্ক্রিয় করা যায়, সর্বোপরি কীভাবে বিদেশি সহায়তায় একটি শক্তিশালী সুশীল সরকারকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখা যায় তার নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল। মামুন বলেন, এক-এগারোর আগে এবং এক-এগারোর সময় সংবাদপত্র দুটির সংবাদ, সম্পাদকীয় এবং মন্তব্য প্রতিবেদন পড়লেই এ ষড়যন্ত্রের আদ্যোপান্ত জানা যাবে।
তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একটি বিশেষ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০৬ সালের শুরু থেকে দেশের প্রভাবশালী একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক সুপরিকল্পিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার চালিয়ে যায়। তথাকথিত ‘যোগ্য প্রার্থী’ বাছাইয়ের নামে এনজিও ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে দেশব্যাপী সেমিনার এবং গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা সৃষ্টি করা। মামুন খালেদ দাবি করেন, ওই সময় কিছু প্রভাবশালী মহল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যেতে কাজ করেছিল। তাঁর ভাষ্যমতে একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সমালোচনার আড়ালে এমন একটি জনমত তৈরি করেছিল, যেখানে রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। তিনি অভিযোগ করেন, এ প্রক্রিয়ায় ‘বিরাজনীতিকরণ’ ধারণাটি সামনে আনা হয় এবং সেটি জনপ্রিয় করতে সংবাদ পরিবেশন ও বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘ওয়ার অ্যাগেইনস্ট টেরর’ সুযোগকে কাজে লাগিয়েছিল এ দুষ্টচক্র।
এক-এগারো-পরবর্তী দুই বছর দেশের ওই প্রভাবশালী দুটি পত্রিকা কেবল সংবাদমাধ্যম হিসেবেই কাজ করেনি, বরং তারা ছিল ডিজিএফআইয়ের অঘোষিত মুখপত্র। গোয়েন্দা সেলে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা বানোয়াট ও কল্পিত তথ্যগুলো কোনোপ্রকার যাচাইবাছাই ছাড়াই ‘বিশেষ প্রতিবেদন’ হিসেবে ছেপে দেওয়া হতো। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ওয়ান-ইলেভেন সরকার আসার পর আগের ধারাবাহিকতায় পত্রিকা দুটি এমন পরিবেশ তৈরি করেছিল, যাতে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রীকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়ন করা সহজ হয়। পরিকল্পনাকে জনসমর্থনযোগ্য করে তুলতে বিভিন্ন প্রতিবেদন, কলাম ও টকশোতে ধারাবাহিকভাবে একটি নির্দিষ্ট বয়ান প্রচার করা হয়েছিল।
মামুন দাবি করেন, মিডিয়াতে কী যাবে না যাবে, তা ঠিক করে দিতেন এ পত্রিকা দুটির সম্পাদকরা। সূত্র বলছেন, পত্রিকা দুটি কেবল নেতিবাচক খবরই ছাপত না, বরং তারা রাজনৈতিক দলের ভিতর বিভেদ তৈরির কারিগর হিসেবেও কাজ করেছিল। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ও তথাকথিত ‘সংস্কারপন্থি’ নেতাদের ব্যাপকভাবে প্রমোট করা হতো ওই দুই পত্রিকায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতাদের যখন রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছিল, তখন এ পত্রিকাগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বিরাজনীতিকরণের নীলনকশা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিল। ‘তারেক রহমানের বিচার হতেই হবে’ শিরোনামে এক সম্পাদক প্রথম পৃষ্ঠায় কলাম লেখেন। রিমান্ডে খালেদ মামুন বলেছেন, বিভিন্ন সরকারের কঠোর সমালোচনা করলেও কোনো সরকারই তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে আঘাত করেনি, বরং তাদের সম্পদ ও প্রভাব ক্রমে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।
মইনের চায়ের দাওয়াতে দুই সম্পাদক : গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে মামুন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এগুলো তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। মামুন জানিয়েছেন, ক্ষমতা দখলের তিন দিন আগে ৮ জানুয়ারি দুই সম্পাদক সেনা সদরে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা সেখানে দুই ঘণ্টার বেশি অবস্থান করেন বলে জানান মামুন। মামুন দাবি করেছেন, এ বৈঠকেই ক্ষমতা দখলের খুঁটিনাটি বিষয় চূড়ান্ত হয়।
ইয়াজ উদ্দিনের বক্তৃতা লিখে দেন বাংলা দৈনিকের সম্পাদক : তদন্ত কর্মকর্তাদের মামুন জানিয়েছেন, মইন এবং তাঁর সঙ্গীরা যখন বঙ্গভবনে যান তখন তাঁদের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতির একটি লিখিত ভাষণ ছিল। এ ভাষণেই ইয়াজ উদ্দিন আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। জানা গেছে, এ ভাষণটি লিখে দিয়েছিলেন সুশীল সমাজের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত বাংলা দৈনিকের সম্পাদক। মামুন জানান, তৎকালীন সেনাপ্রধান নিজেই তাঁকে এ তথ্য দিয়েছিলেন। মামুন তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, এক-এগারোর সবকিছু জানেন দুই সম্পাদক। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই এক-এগারোর রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব।