ইরানের সভ্যতা মুছে দিতে চেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ নিয়তির নির্মম পরিহাস-উলটো এখন ট্রাম্পই বিপাকে। তার দম্ভই চূর্ণ হলো। সময় নির্ধারণ করে যখন একটি দেশের মানুষকে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন-খোদ যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের অনেকে তার সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছিলেন বলে অপসারণের দাবি জোরালো হয়।
এদিকে ট্রাম্পের দেশ ও জাতি ধ্বংসকারী নজিরবিহীন হুমকির টাইমলাইন পার হতে যখন মাত্র ১০ মিনিট বাকি ছিল তখন অপরাজেয় অকুতোভয় বিপ্লবী জাতি ইরানের শর্ত মেনেই ট্রাম্প দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধ স্থগিত করার ঘোষণা দেন। শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের এভাবে পিছু হটার মধ্য দিয়ে তিনি প্রকারান্তরে নিজের সভ্যতা ও অর্জনকে নিজেই মুছে দিয়েছেন। এমনটিই মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল।
টানা ৪০ দিনের প্রলয়ংকরী যুদ্ধ। ৫ হাজার ৩শর বেশি মানুষের প্রাণহানি। লক্ষাধিক স্থাপনা ধ্বংস ও বিপুল সম্পদের ক্ষতি। বাজছিল পারমাণবিক বিপর্যয়ের সাইরেন। হুংকার ছিল সভ্যতা ধ্বংসের। ঠিক এমন এক খাদের কিনারা থেকে শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়াল বিশ্ব। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া মধ্যপ্রাচ্যে উড়ল যুদ্ধবিরতির শান্তির পতাকা। বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের এক ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়েছে। পাকিস্তানের নিবিড় মধ্যস্থতায় এই ‘অসম্ভব’ চুক্তি আলোর মুখ দেখল। এতে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে বোমারু বিমান ও মিসাইলের গর্জন। আগামীকাল শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বসছে দুই দেশের সরাসরি শান্তি বৈঠক। তবে এই দুই সপ্তাহ পর কী হবে, তা নিয়ে এখনো চরম উৎকণ্ঠায় পুরো বিশ্ব।
যুদ্ধবিরতির চুক্তির মূল শর্ত হলো-ইরান অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে এবং আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে সব ধরনের সামরিক হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখবে। যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ‘প্রিয় ভাই’ সম্বোধন করে ‘অক্লান্ত পরিশ্রমের’ জন্য তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরাঘচির সেই বার্তাটি নিজের মালিকানাধীন ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ শেয়ার করেছেন। এর পরপরই বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৬টায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লেখেন, ‘অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঘোষণা করছি, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের নিয়ে লেবাননসহ সব জায়গায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা এখনই কার্যকর হবে।’ তবে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইল। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও সামরিক বাহিনীর পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে তারা রাজি। তবে এর মধ্যে লেবানন অন্তর্ভুক্ত হবে না। এর জবাবে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবানন ফ্রন্টকে অন্তর্ভুক্ত করা না হলে এই চুক্তি পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরান উভয় পক্ষই একে নিজেদের বিজয় বলে দাবি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে তাদের ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জিত হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্নের কোনো অবকাশ নেই। এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিজয়।
এদিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল যুদ্ধবিরতিকে নিজেদের ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলে দাবি করেছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই ইরান তাদের ১০ দফা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রকে মেনে নিতে বাধ্য করেছে। ওই প্রস্তাবে ভবিষ্যতে আগ্রাসন না চালানোর নিশ্চয়তা, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি মেনে নেওয়া, অঞ্চলটি থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করা এবং ক্ষতিপূরণের কথা উল্লেখ আছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ধ্বংসস্তূপের বুক চিরে তেহরানসহ পুরো ইরানের রাস্তায় নেমে আসে লাখ লাখ জনতা। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ হাজারো স্বজন হারানোর তীব্র শোককে শক্তিতে পরিণত করে তারা এই সাময়িক বিরতিকে ‘প্রতিরোধ ফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসাবে উদযাপন করছে। মার্কিন ও ইসরাইলি পতাকায় আগুন জ্বালিয়ে উল্লসিত জনতা বলছেন, আমেরিকা আমাদের আকাশ ধ্বংস করলেও, আমরা তাদের অহংকার চূর্ণ করেছি।’ খবর বিবিসি, এএফপি, আল-জাজিরা ও তাসনিম নিউজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের।
কাল ইসলামাবাদের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নেতৃত্ব দেবেন যারা : শান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলকে ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। আগামীকাল এ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানীতে অনুষ্ঠিতব্য এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দিতে পারেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। আর ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের ঘালিবাফের।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ‘শোচনীয় পরাজয়’ বলছে রাশিয়া : রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বিনা উসকানিতে একপাক্ষিক ও আগ্রাসী হামলা চালিয়েছে। এ যুদ্ধে দেশ দুটি ‘শোচনীয় পরাজয়’ বরণ করেছে। স্পুতনিক রেডিওকে বুধবার মারিয়া আরও বলেন, আমাদের দেশ একেবারে শুরু থেকে, প্রথম বিবৃতিতেই বলেছিল, এ আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। এ পরিস্থিতির কোনো সামরিক সমাধান নেই।
হাতের আঙুল এখনো ট্রিগারে-ইরানের হুঁশিয়ারি : ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষের প্রতি পূর্ণ অবিশ্বাস রেখেই ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হবে। ইরান এ আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহ সময় বরাদ্দ করেছে, যা উভয় পক্ষের সম্মতিতে পরে বাড়ানো যেতে পারে। ইরানি জনগণের উদ্দেশে বিবৃতিতে বলা হয়, এই সময়ে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং ‘বিজয় উদ্?যাপন’ অব্যাহত রাখা জরুরি। পরিষদ উল্লেখ করেছে যে, এ আলোচনা মূলত যুদ্ধক্ষেত্রেরই একটি ধারাবাহিকতা এবং এটি সরাসরি ‘বিপ্লবী নেতৃত্ব’ ও ‘ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ের’ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যদি যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর আত্মসমর্পণ আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক অর্জনে রূপ নেয়, তবে আমরা এই ঐতিহাসিক বিজয় একসঙ্গে উদযাপন করব। অন্যথায় ইরানি জাতির সব দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা পুনরায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই চালিয়ে যাব। শত্রুপক্ষকে হুঁশিয়ারি দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, আমাদের হাতের আঙুল এখনো ট্রিগারে রয়েছে। শত্রুর সামান্যতম ভুল বা বিচ্যুতির মোক্ষম জবাব দেওয়া হবে পূর্ণ শক্তি দিয়ে।
৪০ দিনের যুদ্ধে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ৫৩৭২ জন নিহত হয়েছেন। মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানে অন্তত ৮২ হাজার ৪১৭টি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-এর মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে মোট ৩ হাজার ৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪৩ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। তবে আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির হিসাবে এই নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৯০০ জন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ১৩ জন সেনা নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হয়েছেন। এছাড়া ইস্পাহানে পাইলট উদ্ধারে গিয়ে দুটি অত্যাধুনিক ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ও একটি সি-১৩০ পরিবহণ বিমান হারিয়েছে পেন্টাগন।
এদিকে তেল আবিবসহ ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে সরাসরি আঘাত হেনেছে ইরানের শত শত মিসাইল। ইসরাইলের অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও লেবানন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দেশটিতে ২৩ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের আরও ১১ জন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
এই যুদ্ধ শুধু এই তিন দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর বাইরে লেবানন, ইরাক, কাতার, ওমান, কুয়েত, সৌদি আরবসহ মোট ১১টি দেশ ও অঞ্চলে আরও অন্তত ১ হাজার ৬৮৯ জন নিহত হয়েছেন।
ইসলামাবাদের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব : ১৪ দিনের এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফেরাবে, নাকি এটি আরও বড় কোনো প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস? আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সমর-বিশ্লেষকদের মতে, আসল স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হবে আগামীকাল শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। অত্যন্ত গোপনীয় এই বৈঠক এবং যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল বিভিন্ন শঙ্কার কথাও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে দুই পক্ষের পাহাড়সম শর্তের ফারাক। একদিকে ট্রাম্পের ১৫ দফা-যেখানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস ও প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা বন্ধের কড়া দাবি রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের ৫ দফা-যেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের বিশাল আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে। এছাড়া এই আলোচনার অন্যতম দুর্বল দিক ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির খবরের পরপরই নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন যে, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের লড়াই থামবে না। লেবানন, সিরিয়া বা ফিলিস্তিনে ইসরাইল যদি এই ১৪ দিনের মধ্যে নতুন করে বড় কোনো আগ্রাসন চালায়, তবে ইরানের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো (হুতি, ইরাকি মিলিশিয়া) হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। ফলে যে কোনো ভুল পদক্ষেপে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে এই আলোচনা।