মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই বাংলাদেশে পেট্রোলপাম্পের সামনে অকটেন এবং পেট্রোলের জন্য যুদ্ধ শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থেমে গেলেও বাংলাদেশের পেট্রোলপাম্পের সামনে অকটেন কেনার যুদ্ধ কিন্তু শেষ হয়নি। পাম্পের সামনের বাইক ও গাড়ির সারি আরও দীর্ঘ হয়েছে। চাহিদার অর্ধেক অকটেন বাংলাদেশেই তৈরি হয়। বাকিটা আমদানি হয়। মাসে অকটেনের চাহিদা ৩৭ হাজার টন হলেও ৮ এপ্রিল পর্যন্ত অকটেনের মজুত ১৫ হাজার টনের বেশি। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ২৫ হাজার টন অকটেনের জাহাজ খালাসের অপেক্ষায়। আগামী ১৬ এপ্রিল আরও একটি জাহাজ ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে বন্দরে ভিড়বে। এর বাইরে এ মাসে স্থানীয় ফ্রাকসেনেশন প্ল্যান্ট সুপার পেট্রোকেমিক্যাল বিপিসিকে ৩৫ হাজার টন এবং পেট্রোমেক্স, অ্যাকোয়া ১২ হাজার টন অকটেন সরবরাহ করবে বিপিসিকে। পেট্রোলেও মজুত যথেষ্ট। সাকুল্যে এ মাসে বিপিসির অকটেনের মজুত দাঁড়াবে ১ লাখ ১২ হাজার ২৩২ টন। অথচ বিপিসির অকটেন মজুতের ধারণ ক্ষমতা হচ্ছে ৫৩ হাজার টন। বাকি অকটেন এখন কেরোসিনের ডিপোতে রাখার চিন্তা করলেও অকটেনের রেশনিং চালিয়ে যেতে চায় সরকার। বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল অকটেনের রেশনিং তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও সরকার অনড় অবস্থানে। কারণ প্রতিলিটার অকটেন ১২০ টাকা বিক্রি হলেও সরকারের ক্রয়মূল্য ১৫০ টাকার বেশি। তাই দাম সমন্বয় না করা পর্যন্ত অকটেন ডিপোতে রেখে দেওয়ার পক্ষে সরকার।
বিপিসি জানায়, এপ্রিলের শেষে অকটন মজুত থাকবে ৭৫ হাজার ২৩২ টন। অথচ দেশে অকটেন মজুতের ক্ষমতা হচ্ছে ৫৩ হাজার ৩৬১ টন। বাকি অকটেন এখন চট্টগ্রামে কেরোসিনের ডিপোতে রাখার ব্যবস্থা করছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি কর্মকর্তারা আপাতত রেশনিং ছেড়ে দিয়ে চাহিদামতো অকটেন সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছিল সরকারকে। কিন্তু সরকার আপাতত মজুত বা অস্বাভাবিক চাহিদা অনুযায়ী অকটেন সরবরাহ করতে রাজি নয়। কারণ প্রতিলিটার অকটেন ১২০ টাকা বিক্রি হলেও সরকারের ক্রয়মূল্য ১৫০ টাকার বেশি। তাই দাম সমন্বয় না করা পর্যন্ত অকটেন ডিপোতে রেখে দেওয়ার পক্ষে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতিতে স্বস্তিতে বাংলাদেশ। এপ্রিল মাসে তেলের ১৭টি পার্সেল বা জাহাজের মধ্যে ১৫টির বেশি পার্সেল নিশ্চিত করা হয়েছে বিপিসিকে। এমনকি এই মাসে ভারত আরও ২৫ হাজার টন করে ৫০ হাজার টন ডিজেল দিতে সম্মত হয়েছে। তাই যুদ্ধবিরতি চলমান থাকলে আপাতত এ মাসে ডিজেল নিয়েও কোনো সমস্যা হবে না। জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মুনির হোসেন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির। আপাতত জ্বালানি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, গত ২ মার্চ থেকে সৌদি আরবের রাস্তানুর বন্দরে আটকে আছে ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য কেনা এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বোঝাই জাহাজ নরডিক পুলেক্স। ভালো খবর হচ্ছে যুদ্ধবিরতির পর সেটি বাংলাদেশে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। সেই প্রণালি অতিক্রম করার আগেই নরডিক পুলেক্স জাহাজ আটকা পড়ে।
নরডিক পুলেক্স জাহাজের এজেন্ট বাংলাদেশ শিপিং কোম্পানি-বিএসসি। সেই বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বুধবার রাতে যুগান্তরকে বলেছেন, নরডিক ২ তারিখ থেকে অপরিশোধিত তেল বোঝাই করে। এখন জাহাজটি নিজেদের তেল এবং খাবার সংগ্রহ করছে। ওইসব নেওয়ার পর নরডিক বিএসসিকে জানাবে কখন তারা হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। ব্যান্ড ত্রুদ্ধড অয়েল প্রতি ব্যারেলে আগের চেয়ে ১৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৯৩ ডলার, যা কয়েকদিন আগেও ১১৫ ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর মারবান ক্রুড (যেটি ইস্টার্ন রিফাইনারি ব্যবহার করে) ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৯৫ ডলারে। বিপিসি এবং জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এপ্রিলে ১৭টি তেলের জাহাজ বা পার্সেলের মধ্যে ১৫টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বাকি দুটি পার্সেল নিশ্চিত করতে চেষ্টা করা হচ্ছে। বিপিসি জানিয়েছে, যুদ্ধকালীন ১৭টি পার্সেলের মধ্যে মাত্র ৭টি পার্সেল নিশ্চিত করা গিয়েছিল। এখন যুদ্ধবিরতির পর ২টি ছাড়া সব পার্সেল পাওয়া যাচ্ছে। এটি বড় খবর। বিশেষ করে ডিজেল এই মাসে ৩ লাখ টনের বেশি আসবে। সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার যুগান্তরকে বলেছেন, দেশের এপ্রিল এবং মে মাস চাহিদা অনুযায়ী সুপার পেট্রোকেমিক্যাল অকটেন এবং পেট্রোল সরবরাহ দিতে পারবে। তিনি বলেন, প্রতিমাসে অকটেন এবং পেট্রোলের চাহিদা হচ্ছে ৭০ হাজার টনের মতো। এর মধ্যে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল একাই ৫০ শতাংশের বেশি পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ করতে পারবে এবং সরকার যেভাবে চাইবে সেভাবে তেল সরবরাহ দেওয়া যাবে।
জানা গেছে, বিমানের জ্বালানি জেট ফুয়েল নিয়েও বিপাকে আছে বিপিসি। এখন জেট ফুয়েলের মজুত আছে ৭৩ হাজার ৮৮ টন। আর এই মাসে জেট ফুয়েল আসবে ৬১ হাজার টন। সব মিলিয়ে জেট ফুয়েল থাকবে ১ লাখ ৩৫ হাজার টনের মতো। অথচ ধারণ ক্ষমতা হচ্ছে ৬৪ হাজার ১১৮ টন। প্রতিমাসে জেট ফুয়েল ব্যবহার হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টন। জেট ফুয়েল বিতরণ করে একমাত্র পদ্মা অয়েল কোম্পানি। ওই কোম্পানির এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, আগামী ১৭ তারিখ থেকে হজ ফ্লাইট চালু হবে। সেই হিসাবে এই মাসে জেট ফুয়েলের চাহিদা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। চাহিদা বাড়লে জেট ফুয়েল রাখা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। এদিকে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ১০ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা শুরু হবে ইসলামাবাদে। সেই আলোচনায় স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিরতি হলে পুরো বিশ্বের জন্য ভালো। নতুবা জ্বালানি তেলের দাম আবার বাড়বে। তখন আবারও বিপাকে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
জয়যাত্রার যাত্রা শুরু : যুদ্ধ শুরুর পর গত ৩ মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালির ওই প্রান্তে আটকে আছে বাংলাদেশি জাহাজ জয়যাত্রা। বিএসসির এই জাহাজে আটকা পড়েছিল ৩২ জন ক্রু। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক যুগান্তরকে বলেছেন, জয়যাত্রা সৌদি আরব থেকে সার বোঝাই করে হরমুজ প্রণালি থেকে ৪০০ নটিক্যাল মাইল দূরে। তারা রওয়ানা দিয়েছে। তাদের হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে বলা হয়েছে। জাহাজটি বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ৮টার সময়ই হরমুজ প্রণালির কাছে যাওয়ার কথা। ততক্ষণে হরমুজ প্রণালি পার হতে ইরানের আইআরজেসি’র অনুমতি পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের আগেও বাংলাদেশের জয়যাত্রা হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। আর যুদ্ধবিরতির কারণেও হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার কথা। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে হরমুজ পার হওয়া যাবে না। জানা গেছে, জয়যাত্রা সেখান থেকে ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে পণ্য বোঝাই করে যাওয়ার কথা।