বাংলা ভাষার কবি সুকান্তের কালজয়ী উচ্চারণ, ‘সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’। উপনিবেশবাদবিরোধী অগ্নিগর্ভ বাংলার সেই মরণজয়ী অসম সংগ্রামের অবিস্মরণীয় তপ্ত লাভা যেন ফেটে পড়েছে এই চরণ দুটির অক্ষরে অক্ষরে। আজকের পৃথিবী যেন আবার নতুন করে সন্ধান পেল অনন্যসাধারণ দেশপ্রেম ও তুলনাহীন সাহসে উদ্দীপ্ত আরেক অমিততেজা মানবিক ভূখণ্ডের। সেই ভূমির নাম ইরান। সত্যিকার অর্থেই আজকের ইরান বিশ্বের বিস্ময়। এত বিস্ময় কখনো দেখেনি কেউ।
হিংস্র মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, অবৈধ ইসরাইলের আধিপত্যবাদের চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় ও অন্যায্য যুদ্ধের প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়ে, একলা এক ইরান, ইরানের অসম সাহসী বীর জনগণ যা দেখাল, যে দৃষ্টান্ত তারা রচনা করল, তা যেন নতুন কালের এক ‘শাহনামা’। মহাকবি ফেরদৌসীর শাহনামা থেকে যেন লক্ষ কোটি রুস্তম, জাল, আফ্রোসিয়ায় যেন নেমে এসেছিল ইরানের প্রতিটি জনপদে, প্রতিজন ইরানির হৃদয়ে। আর বর্বর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কীভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়, তা দেখিয়ে ইরান হয়ে উঠল ধ্রুবতারা। ইমাম হোসেনের সার্থক উত্তরাধিকারী। আজকের পৃথিবীর প্রতিরোধের প্রতীক তাই তো ইরান। সর্পস্কন্ধী জাহহাকের লালসা ও ক্ষমতার দম্ভ ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে ইরান প্রমাণ করল শত্রু যত বড়ই হোক, সত্য ও ন্যায়ের বিজয় অনিবার্য।
অসভ্য, বর্বর হিংস্র হামলার ৪০টি দিনের চল্লিশ সেকেন্ড সময়ের জন্য কখনো প্রতিরোধের রণাঙ্গন থেকে সরে যায়নি ইরান। বোমার বদলে বোমা, মিসাইলের বিরুদ্ধে মিসাইল ছুড়ে শত্রুর ভূখণ্ড ও মনোবল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইরান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো উন্মাদ এবং নেতানিয়াহুর মতো রক্তপিপাসু দানবকে বুঝিয়ে দিয়েছে কত ধানে কত চাল। দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ নেওয়ার যে শিক্ষা ইরান বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে দিল-তা বহুকাল রূপকথার মতো জেগে থাকবে মানবভূগোলে।
ট্রাম্পের নৃশংস ক্রূর কুটিল হুংকার, ইরান যদি তার দাবি মেনে না নেয়, তাহলে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে আজ রাতেই ইরানি সভ্যতাকে মুছে দেওয়া হবে।-এই ঘোষণা শেষ হওয়ার আগেই ইরান পালটা জবাব দিয়ে স্তম্ভিত করে দিয়েছে মার্কিনি ও ইসরাইলি ঘাতকদের। আলটিমেটাম শেষ হওয়ার শেষ ১০ মিনিট ছিল টানটান উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তায় প্রকম্পিত। সারা পৃথিবী যেন হয়ে পড়েছিল কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কিন্তু আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেনির ইরান অন্য ধাতুতে গড়া। আক্রমণ, পালটা আক্রমণে নাস্তানাবুদ আগ্রাসী শক্তির হতভম্ব চোখের সামনে লক্ষ লক্ষ ইরানি নেমে এলো রাস্তায়। সম্ভাব্য আক্রমণস্থলগুলো উদ্ভাসিত হলো মানববন্যায়। নিজের দেশকে রক্ষার জন্য ইরানি জনগণ যে অনির্বচনীয় দেশপ্রেম, সাহস ও সততার নজির স্থাপন করল, জীবন ও মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে, শাহাদতের তামান্না নিয়ে যেভাবে রুখে দিল অসুরদের-তা বিশ্বের এখন সকল কালের সকল স্বাধীনতাকামী নির্যাতিত মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। শোকের কারবালাকে শক্তির ভরকেন্দ্রে পরিণত করেছে ইরান।
শেষ পর্যন্ত দাঁত, নখ, চোখ হারিয়ে ঘরে-বাইরে প্রবল চাপে দিশেহারা ঘাতকরা ইরানি শর্তানুযায়ী মেনে নিল যুদ্ধবিরতি। আর আম ও ছালা দুটোই গেল ট্রাম্পের। এখানেই ইরানের বিজয়। ইরানের এই বিজয় এখন পথ দেখাবে বাদবাকি বিশ্বকে। এই যুদ্ধবিরতির পর অবশ্যই বদলে যাবে বিশ্বব্যবস্থা। মার্কিনি ও ইসরাইলিদের দাঁত ঘষটানিকে আর কেউ পাত্তা দেবে না। ইরান হয়ে উঠবে মধ্যপ্রাচ্যের মূল নিয়ন্ত্রক। ইরান প্রমাণ করেছে আগ্রাসী আক্রমণকারীদের হম্বিতম্বি দেখে ভয় পাওয়ার দিন শেষ। ইরান এখন বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের তীর্থভূমি।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের অভয়বাণীই যেন ইরান বলছে,
‘সত্য পথের তীর্থ পথিক ভয় নাই নাহি ভয়,
শান্তি যাদের লক্ষ্য তাদের নাই নাই পরাজয়।’