বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। টানা ৩ বছর ধরে প্রবৃদ্ধির হারে ধীর গতি, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কর্মসংস্থানের গতি বাড়ছে না, চড়া মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে, ব্যাংকিং খাতে সংকট প্রকট হয়েছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতাও প্রকট হচ্ছে। অর্থনীতির ওইসব সূচকে নেতিবাচকতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এতে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এসব সংকটকে আরও নাজুক করে তুলছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির এমন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা, বিভাগীয় পরিচালক জ্য পেম ও বেসরকারি খাত বিশেষজ্ঞ ম্যাগুয়ে প্রমুখ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্তমানে ঊর্ধ্বমুখী দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে যাবে। যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে।
অর্থনীতির এমন নেতিবাচক পরিস্থিতি এড়াতে ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করতে সরকারকে জরুরিভিত্তিতে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম অগ্রাধিকারভিত্তিতে চালিয়ে যেতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়িয়ে সরকারের বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে চাঙা করতে হবে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। তা না হলে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বাড়ছে।
২০২৫ সাল পর্যন্ত এ হার কমেনি, বরং বেড়েছে। এর নেপথ্যে প্রধান কারণ ছিল টেকসই উৎপাদনশীল খাত গড়ে না ওঠা এবং এসব খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা। ফলে শ্রমিকদের আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে দুর্বল। এর বিপরীতে মূল্যস্ফীতির হার উচ্চ মাত্রায় বেড়েছে। আয়ের প্রবৃদ্ধি চলে গেছে মূল্যস্ফীতির পেটে। ফলে দারিদ্র্য বেড়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান কমেছে। জিডিপির সীমিত প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য কমানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, টানা তিন বছর ধরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার মন্থর। কর্মসংস্থান বাড়ার হার নিম্নমুখী। ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে যাচ্ছে দারিদ্র্য। উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। এসব চাপে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতা সার্বিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। ফলে ২০২৫ সালে কমপক্ষে আরও ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধির হার বাধাগ্রস্ত হবে। এতে নতুন করে আরও ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে।
চলতি অর্থবছরের এখন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৮ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। গত অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাত বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে চলে গেছে। অর্থাৎ ৭ শতাংশের নিচে নেমেছে। ব্যাংকিং খাত ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। মূলধন রাখার সক্ষমতা কমে গেছে। লোকসান সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা কাটাতে আর্থিক খাতের জন্য দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। আমদানি ব্যয় বেড়ে গিয়ে বৈদেশিক খাতে চাপ সৃষ্টি করবে। রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পেতে পারে। এতে বিনিময় হারের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। এসব ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য খুবই সীমিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জাতীয় নির্বাচনের পর দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি বাড়াতে ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য সরকারকে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে হবে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করাসহ উন্নত অবকাঠামোগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।