Image description

দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এবং জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে জ্বালানি তেলে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বর্তমানে জ্বালানি তেলের মধ্যে শুধু ডিজেল বিক্রিতেই দৈনিক প্রায় ৭৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই ভর্তুকি অব্যাহত রেখে সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির মূল্য অপরিবর্তিত রাখার নীতিতে অটল রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বল্প মেয়াদে ভর্তুকি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর আর্থিক চাপ রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবু বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের স্বার্থ রক্ষায় এই নীতি অব্যাহত রাখার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার দেশে মোট জ্বালানি তেল বিক্রি হয় ১৬ হাজার ৩৮ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধু ডিজেলই বিক্রি হয় ১১ হাজার ৬০৮ মেট্রিক টন। ডিজেলের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে এক মেট্রিক টন সমান এক হাজার ১৮৬ লিটার ধরে হিসাব করে বিপিসি।

এখন প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১৫৫ টাকা। খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১০০ টাকায়। লিটারে ৫৫ টাকা ভর্তুকির হিসাবে ডিজেলেই দৈনিক সরকারকে প্রায় ৭৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ডিজেল বিক্রিতে যদি এই হারে ভর্তুকি দিতে হয় তাহলে আগামী এক মাস ডিজেলেই ভর্তুকি লাগবে দুই হাজার ২৭১ কোটি টাকার ওপরে।

বিপিসির তথ্য বলছে, গত রবিবার অকটেন বিক্রি হয় এক হাজার ১৬৪ মেট্রিক টন। এ ছাড়া পেট্রল এক হাজার ৩০৫ মেট্রিক টন, ফার্নেস অয়েল ১২৫ মেট্রিক টন, জেট ফুয়েল এক হাজার ৬৩১ মেট্রিক টন এবং কেরোসিন ২০৫ মেট্রিক টন বিক্রি হয়। তবে ওই দিন মেরিন ফুয়েল বিক্রি হয়নি।

জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও সরকার তা সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিফলিত করেনি। বরং বিদ্যুৎ উৎপাদন, গণপরিবহন, সেচ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত না হয়, সেই বিবেচনায় বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে সরকার।

এ বিষয়ে জ্বালানি ও খণিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫৫ টাকা। দেশে ডিজেলের চাহিদা বেশি হওয়ায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আরো বলেন, এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং এ নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। মার্চ মাসে বাতিল হওয়া দুটি শিপমেন্ট এপ্রিলেই এসে পৌঁছবে, যা পরিস্থিতির জন্য ইতিবাচক হবে। এ ছাড়া মে মাস পর্যন্ত পেট্রল ও অকটেনের সরবরাহ নিয়েও কোনো সমস্যা হবে না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব ফেলে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে সরকার মূল্য সমন্বয়ের পরিবর্তে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার পথ বেছে নিয়েছে।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার জ্বালানি তেলে স্বল্প মেয়াদে বা এক-দুই মাস ভর্তুকি দিতে পারে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি হলে দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। অর্থনীতিতে চাপ পড়লেও চলতি এপ্রিল মাসটিতে ভর্তুকি দেওয়া উচিত। পরে বৈশ্বিক পরিস্থিতি দেখে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শুধু বাংলাদেশ না, এখন বিশ্বের প্রতিটি দেশ জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপে রয়েছে। আমি আশা করছি, চলতি মাসে যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জ্বালানি তেলের ব্যবহার ছিল প্রায় ৫৫ লাখ মেট্রিক টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। বর্তমানে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই ডিজেল, যা কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি ব্যবহৃত হয়। বাকি ৩০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে পেট্রল, অকটেন, কেরোসিন, ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানি তেল। দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৯২ শতাংশই আমদানি করা হয়। বাকি প্রায় ৮ শতাংশ আসে স্থানীয় উৎস থেকে, বিশেষ করে গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে।

বন্দরে ভিড়েছে ৪ জ্বালানি পণ্যবাহী জাহাজ, খালাস হচ্ছে দ্রুতগতিতে : দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং গ্যাস অয়েলবাহী চারটি বড় জাহাজ। গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মেরিন বিভাগ থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব জ্বালানি পণ্য নিয়ে জাহাজগুলো চটগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। বর্তমানে এই জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া চলছে।

আগত জাহাজগুলো হলোগ্যাস চ্যালেঞ্জার : ভারত থেকে এলপিজি নিয়ে জাহাজটি গত ৩১ মার্চ বন্দরে পৌঁছে। বর্তমানে এটি ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থান করছে। শান গ্যাং ফা শিয়ান : মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস অয়েল নিয়ে আসা এই জাহাজটি ৩ এপ্রিল বন্দরে ভিড়েছে। এটি বর্তমানে জেটিতে অবস্থান করছে এবং আজ মঙ্গলবারের মধ্যে এর পণ্য খালাস সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। কুল ভয়েজার : নাইজেরিয়া থেকে এলএনজি নিয়ে আসা বিশাল এই জাহাজটি ৫ এপ্রিল বন্দরে পৌঁছেছে। বর্তমানে এটি এলএনজি টার্মিনালে অবস্থান করছে এবং ৮ এপ্রিলের মধ্যে এর কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গ্যাস জার্নি : চীন থেকে এলপিজি নিয়ে আসা এই জাহাজটিও ৫ এপ্রিল বন্দরে ভিড়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে এই জ্বালানি পণ্য দ্রুত খালাসে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সব জাহাজ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পণ্য খালাস শেষ হবে।

তেল নিতে পাম্পে রাতেও ভিড় : এদিকে দিন যত যাচ্ছে, রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে লাইন ততই দীর্ঘ হচ্ছে। এখন গভীর রাতেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর বিজয় সরণি, আসাদগেট, খিলক্ষেত, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় মধ্যরাতেও শত শত মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্রাক জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেকে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। এতে ভোগান্তি বাড়ছে সাধারণ মানুষের।

দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার কারণে চালকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে, যা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ভাঙচুর ও মারামারির ঘটনাও ঘটছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট মূলত আমদানির ঘাটতির কারণে নয়; বরং পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার ফল। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে জনদুর্ভোগ আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তেলের সরবরাহে তেমন ঘাটতি নেই। আগে যে জ্বালানি তেল দুই দিনে বিক্রি করত, বাড়তি চাপের কারণে সেটি এখন মাত্র তিন-চার ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ এখনো আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি তেল কিনছে বলেও তারা জানায়।