Image description

দারিদ্র্য বিমোচনে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও কৃষক কার্ডে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এছাড়া বিদ্যমান কর্মসূচির আওতায় বৈষম্য কমাতে কর্মসূচি সম্প্রসারণ, নতুন উপকারভোগী অন্তর্ভুক্তি এবং ভাতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিও বাড়ানো হবে। এই কর্মসূচির আওতায় সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি। এ লক্ষ্যে আগামী অর্থবছর থেকে দেশের ৫৩১টি উপজেলায় উপকারভোগীর সংখ্যা পাঁচ লাখ বাড়িয়ে ৬০ লাখ হতদরিদ্র পরিবারকে ১৫ টাকা কেজি দরে মাসে ৩০ কেজি করে ভিটামিনসমৃদ্ধ চাল দেওয়া হবে। চলমান বৈশ্বিক সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সরকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চালের দাম বাড়াবে না। বর্তমান নিত্যপণ্যের বাজারে জাত ও মানভেদে ৫৫-৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি চাল।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আসন্ন অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি, উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধীসহ ১৫টি কর্মসূচির আওতায় প্রায় সাড়ে ১১ লাখ নতুন সুবিধাভোগী যুক্ত হবে। ভাতা ৫০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন হারে বাড়ানো হবে। এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আগামী অর্থবছরের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। এতে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাসহ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত ১৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়। সংশোধিত ভাতা আগামী অর্থবছর (জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাত আরও শক্তিশালী করা হবে। বিদ্যমান কর্মসূচির পাশাপাশি ধাপ ধাপে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষক কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হবে।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের ওপর গুরুত্বারোপ : সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এবার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ বর্তমান সরকারের নতুন উদ্যোগ। বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে এ বিষয় দুটি আগেই সন্নিবেশিত করা হয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বয়ং এ দুই কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের বিষয়টি তদারকি করছেন। আগামী অর্থবছরে আরও ৪০ লাখ পরিবারের নারীপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। পাইলটিং কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবারকে এখন মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। আগামী দিনে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হবে। এতে সরকারের প্রয়োজন হবে ১৩ হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি এই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারি (ডিও) পত্র দিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন। এছাড়া দেশের কৃষি খাতে স্বচ্ছতা ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে কৃষক কার্ড চালু করেছে সরকার। প্রি-পাইলটিং কার্যক্রমে প্রথম ধাপে ২১ হাজার ১৪ জন কৃষককে কার্ড দেওয়া হবে। তবে আগামী অর্থবছরে এই কর্মসূচি বড় পরিসরে চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। উল্লেখ্য, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪.৭৮ শতাংশ। তবে পেনশন বাদ দিলে কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ প্রায় ৯১ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ আরও বাড়তে পারে। চলতি বাজেটে ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় নতুন বাজেটে বরাদ্দ ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান একটি মূল সমস্যা। একদিকে রাজস্ব আদায় কমছে, অন্যদিকে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে অর্থনীতিতে। এ বাস্তবতায় সরকার সামাজিক নিরাপত্তায় কতটুকু নজর দিতে পারবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তিনি জানান, সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্যোগগুলো বরাবরই ভালো। কিন্তু সমস্যা হলো-প্রকৃত উপকারভোগীরা সুবিধাগুলো পাচ্ছেন কি না। প্রায়ই দেখা যায়, এক্ষেত্রে অনিয়ম হয়ে থাকে। এ বিষয়গুলো কঠোরভাবে মনিটরিং করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি অর্থবহ হয়ে উঠবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির তুলনায় এখনো কম। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এটি ৫ শতাংশ হওয়া উচিত, যেখানে বাংলাদেশে তা ২ শতাংশেরও নিচে। দেশে আগে কর্মসূচি ছিল প্রায় ১৪০টি। তবে নতুন করে তা কমিয়ে আনা হয়েছে ৯৫টিতে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে-অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সুবিধা নিশ্চিত করা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পুনর্গঠন ইতিবাচক হলেও বরাদ্দ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম। কর্মসূচি কমিয়ে কার্যকারিতা বাড়ানো ভালো উদ্যোগ, তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে দেওয়া হবে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল : খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ২৪৭টি উপজেলায় সাধারণ মানের চাল এবং ২৮৪টি উপজেলায় দেওয়া হচ্ছে পুষ্টিমানের চাল। তবে আগামী দিনে এই কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে পুষ্টিমানের চাল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ভিটামিন এ, বি-১, বি-১২, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন ও জিংক মেশানো হবে।