Image description

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশ হিসেবে বেশ পরিচিতি ছিল দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার। গত তিন বছর আগেও এই তথ্যই জানা ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর রাজাপাকসে সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত আর ভুল নীতিতে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে পড়ে দেশটি। বিশেষ করে গোটাবাইয়া রাজাপাকসে সরকারের কর কমানোর সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

তাছাড়া একের পর এক ভুল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, দিনে ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট, অবকাঠামো উন্নয়নের নামে মেগা প্রকল্পে বিপুল ঋণের বোঝা এবং করোনা মহামারির ধাক্কায় ২০২২ সালে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধ আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রাও সরকারের হাতে ছিল না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াতে হয় সাধারণ মানুষকে। উপায় না পেয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দেশটি। শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক দুর্ভোগ থেকে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে। গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। অথচ সংকট কাটিয়ে দেশটি এখন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে। কঠোর সংস্কার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে ভূমিকা রাখছে।

ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ করা হয়। এতে সরকারের রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সময়ে পর্যটননির্ভর অর্থনীতি ২০১৯ সালের ইস্টার হামলা এবং পরে করোনা মহামারির কারণে বড় ধাক্কা খায়। কমে যায় পর্যটন আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ।

এরপর আসে কৃষিতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন। ২০২১ সালে সরকার আকস্মিকভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক আমদানি নিষিদ্ধ করে দেশকে জৈব কৃষিতে নেয়ার উদ্যোগ নেয়। এতে ধান, চা গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হয়। খাদ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য রপ্তানি থেকেও আয় কমে যায়।

অন্যদিকে, অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বন্দর, বিমানবন্দর, মহাসড়কসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে বিপুল ঋণ নেয়া হয়। এসব প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়তে থাকায় দ্রুত কমতে থাকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এর সঙ্গে করোনা মহামারির পর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় সংকট আরও তীব্র হয়। আন্তর্জাতিক ঋণবাজারে অর্থ সংগ্রহের সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসে।

২০২২ সালে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধ আমদানি কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সংকটে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়। মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়তে থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াতে হয় সাধারণ মানুষকে।

বাধ্য হয়ে ২০২২ সালের এপ্রিলে শ্রীলঙ্কা নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেউলিয়া বা সার্বভৌম ঋণখেলাপি ঘোষণা করে। অর্থনৈতিক দুর্ভোগ থেকে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে। এর পরপরই জনগণের ক্ষোভ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ‘আরাগালায়া’ নামের ওই অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

এই সংকটের দুই বছর পর দায়িত্ব নেয় নতুন সরকার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন শ্রীলঙ্কার বামপন্থি নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। রাজস্ব বাড়ানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ঋণ পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তায় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা শুরু করে তার সরকার।

বিশ্বব্যাংকের সামপ্রতিক হিসাবে, শ্রীলঙ্কা উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ শতাংশ, যা ওই বছরের জন্য বিশ্বব্যাংকের আগের ৩.৫ শতাংশ পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, তিন বছর আগেও যে দেশটি ঋণখেলাপি হয়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ছিল, সংস্কারের মাধ্যমে সেই দেশই এখন ঘুরে দাঁড়ানোর পথে।

বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা। কলম্বোর সংকট ছিল রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন প্রকল্প গ্রহণ এবং আকস্মিক ভুল নীতি গ্রহণ। তেমনি বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি, মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংক খাতের অনিয়ম রোধ করতে না পারলে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশ হুট করে শ্রীলঙ্কা হয়ে না গেলেও, আর্থিক খাতের সুশাসন ধরে রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।