জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইউরোপে সেনা কমানোর হুমকি এবং ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়ায় নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের মধ্যে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের জোট ও অংশীদারিত্বে বাড়াচ্ছে টানাপোড়েন।
ইরানের সঙ্গে প্রায় ১০ সপ্তাহের সংঘাতের পর সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলো। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ মিত্র বিকল্প কৌশল খুঁজতে শুরু করেছে বলে ধারণা করছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। বিশ্লেষকদের মতে, এতে দীর্ঘমেয়াদে বদলে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ধরন। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতিকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিও।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ট্রাম্পের অনিশ্চিত ও খামখেয়ালি নীতির কারণে বৈশ্বিক কূটনৈতিক ভারসাম্যে তৈরি হয়েছে চাপ। বিশেষ করে ন্যাটো সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে তার ক্ষোভ দুর্বল করতে পারে পশ্চিমা জোটকে।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েনের ভাষ্য, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ফেলছে ঝুঁকির মুখে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, এমন দাবি তুলে হামলা চালানো হলেও এর পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। পরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। এর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে ইউরোপে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন ট্রাম্প ঘোষণা দেন, জার্মানি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া হবে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, ইরান ইস্যুতে অপদস্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জের ধরেই ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে অনেকের ধারণা।
এরপর জার্মানিতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা বাতিল করে পেন্টাগন। পাশাপাশি ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা কমানোর বিষয় করা হচ্ছে বিবেচনা।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, মিত্র দেশগুলো যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেনি বলে ট্রাম্প অসন্তুষ্ট। তার ভাষ্য, ইরান যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপের কিছু দেশ তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল।
এর আগেও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে কটাক্ষ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি ব্রিটিশ পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন। পেন্টাগনের কিছু মহল স্পেনের ন্যাটো সদস্যপদ স্থগিত এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্যের দাবির স্বীকৃতি পুনর্বিবেচনার বিষয়ও তুলেছে।
এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। তারা প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো এবং যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনের পরিকল্পনাও করছে।
জাপানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকেশি ইওয়ায়া বলেছেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও সম্মান ক্রমেই কমছে। তার মতে, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো অঞ্চলে পড়তে পারে।
এদিকে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য থেকে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে চীন নিজেকে আরও স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।
আগামী সপ্তাহে ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, মিত্রদের সঙ্গে তার বাড়তে থাকা দূরত্ব বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।