আলোচনার মূল কেন্দ্রে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ পানিপথ হরমুজ প্রণালি। একদিকে অবিলম্বে হরমুজ খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে প্রণালিতে দখল ধরে রেখেছে ইরান। এ ছাড়া লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত হামলার ফলেও চলমান যুদ্ধবিরতি নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত হবে কিনা। হলেও তা কয়দিন টিকে থাকবে। এ সব প্রশ্ন এখন গোলকধাঁধা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে কোনো সুরাহা না হলে এই সমস্যার চিরস্থায়ী কোনো সমাধান হবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান দ্বন্দ্ব-সংঘাত ঘিরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি যেন এক জটিল গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। কাগজে-কলমে যুদ্ধ থামার কথা বলা হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাঠের পরিস্থিতি এখনও অস্থির, অনিশ্চিত এবং বহুস্তরীয় চাপের মধ্যে আটকে রয়েছে পুরো অঞ্চল। এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালি। এই জলপথটি কেবল একটি সমুদ্রপথ নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতির এক বড় ‘ট্রাম্পকার্ড’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দ্রুত হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে স্বাভাবিক নৌচলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে। কেননা এই রুট সচল না হলে ব্যাপক জ্বালানি সংকটে পড়বে তারা। এ ছাড়া এই অচলাবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে ইরান কৌশলগতভাবে প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে চাপ সৃষ্টি করার অবস্থানে রয়েছে, যা তাকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে একটি শক্তিশালী অবস্থান এনে দিয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত সামরিক অভিযান। ইরানের দেয়া যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবাননের কথা থাকলেও ইসরাইল তা মানছে না। তেহরানের মিত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর- তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এই যুদ্ধবিরতি আদৌ স্থায়ী কোনো চুক্তিতে রূপ নেবে কিনা, আর নিলেও তা কতদিন টিকবে- তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান।
এদিকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আজ ইসলামাদে সংলাপে বসার কথা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের। কিন্তু লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকায় তেহরান জানিয়েছে- লেবাননকে বাদ দিয়ে তারা কোনো আলোচনা করবে না। কিন্তু পাকিস্তান জানিয়েছে আলোচনার মঞ্চ প্রস্তুত। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের পথে রয়েছেন (গত রাতে এই রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত তিনি কখন ইসলামাবাদে অবতরণ করবেন- তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, এছাড়া ইরান থেকে সংলাপের জন্য কেউ আসছে কিনা বা এসেছে কিনা তাও জানা সম্ভব হয়নি)।
এমন অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ, আলোচনা ও পাল্টা অবস্থান সামনে আসছে, কিন্তু স্পষ্ট কোনো সমাধানের পথ এখনো দৃশ্যমান নয়। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে কোনো কার্যকর সমঝোতা না হলে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
জেডি ভ্যান্সের সতর্কবার্তা: ইসলামাদে ইরানের সঙ্গে সংলাপ ইতিবাচক হবে বলে জানিয়েছেন জেডি ভ্যান্স। বলেছেন, সংলাপের জন্য তিনি উন্মুখ হয়ে আছেন। শুক্রবার ওয়াশিংটন ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি ভ্যান্স ইরানকে লক্ষ্য করে কড়া বার্তাও দিয়েছেন। ইরানের প্রতিনিধিদলকে লক্ষ্য করে ভ্যান্স বলেন, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চালাকি না করে, অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র সংলাপের বিষয়ে আর ইতিবাচক থাকবে না। সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, ইরানিরা যদি সদিচ্ছার সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত থাকে, তবে আমরা অবশ্যই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবো, সেটা একটা বিষয়। কিন্তু তারা যদি আমাদের সঙ্গে কোনো চালাকি করতে চায়, তবে তারা দেখবে যে, এই আলোচনা কমিটি মোটেও নমনীয় হবে না। ইসলামাবাদ সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে আর কে কে রয়েছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পাকিস্তানের তরফে গত বৃহস্পতিবার বলা হয়, মার্কিন প্রতিনিধিদলে ভ্যান্সের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার উপস্থিত থাকবেন।
যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ অথবা যুদ্ধবিরতির একটি বেছে নিতে হবে: ওয়াশিংটনকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ অথবা যুদ্ধবিরতির একটি বেছে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ। বৃহস্পতিবার বিবিসি’র সঙ্গে আলাপকালে খাতিবজাদেহ বলেন, লেবাননে ইসরাইলি হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির শর্তের গুরুতর লঙ্ঘন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়া জানিয়েছে, বুধবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবাননের কথা উল্লেখ থাকলেও ইসরাইল তা অস্বীকার করছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি কোনো অবস্থাতেই লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতায় বিবেচনা করবেন না। লেবাননকে তিনি ওয়াশিংটনে আলাদা করে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন। লেবানন বলেছে, যদি যুদ্ধবিরতির শর্ত মানা হয় তাহলে তারা তেল আবিবের সঙ্গে কথা বলবেন। লেবাননে ইসরাইলের আতঙ্ক হিজবুল্লাহ। কয়েক দশক চেষ্টা করেও এই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তি খর্ব করতে পারেনি তেল আবিব। উল্টো স্বল্প পাল্লার মিসাইল দিয়ে সবসময়ই ইসরাইলকে তটস্থ রেখেছে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। তাই ইরানের এই মিত্র শক্তিকে প্রথমে নিরস্ত্র করতে চায় তেল আবিব। এরপর লেবাননের মাটি থেকে চিরতরে মুছে দিতে চায় তাদের লড়াই-সংগ্রাম। জাতিসংঘ ইসরাইলকে অবিলম্বে ১৭০১ অধ্যাদেশ মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বিবিসি রেডিও ৪-এর টুডে প্রোগ্রামে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধ ও যুদ্ধবিরতির মধ্যে’ একটি বেছে নিতে হবে এবং একইসঙ্গে কেক রাখা এবং খাওয়া যাবে না।
সর্বোচ্চ সতর্কতায় ইসলামাবাদ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনাকে সামনে রেখে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে জারি করা হয়েছে ‘রেড অ্যালার্ট’। সফররত প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ ও নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সূত্র জানায়, বহু পদক্ষেপের এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে থাকবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তাদের সহায়তায় থাকবে রেঞ্জার্স, ইসলামাবাদ ও পাঞ্জাব পুলিশ। পাশাপাশি, সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে দায়িত্ব পালন করবে ইসলামাবাদ ট্রাফিক পুলিশ ও ন্যাশনাল হাইওয়ে অ্যান্ড মোটরওয়ে পুলিশ। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছে প্রায় ৬ হাজার রাজধানী পুলিশের সদস্য, ৯০০ ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলারি এবং ৩ হাজার পাঞ্জাব কনস্ট্যাবুলারি। এ ছাড়া রেঞ্জার্স ও সেনাবাহিনীর সদস্যরাও মোতায়েন রয়েছেন। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে থাকবেন প্রায় ১ হাজার পুলিশ কর্মকর্তা।
রাজধানীর ‘রেড জোন’ ও উচ্চ নিরাপত্তা এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে সেনাবাহিনী ও রেঞ্জার্স। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাসদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে রাখা হয়েছে কুইক রেসপন্স ফোর্স। মারগাল্লা পাহাড় এলাকাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রেড জোনে প্রবেশের সব পথ বন্ধ রাখা হয়েছে, শুধুমাত্র মারগাল্লা রোড দিয়ে অনুমোদিত ব্যক্তি ও বাসিন্দারা প্রবেশ করতে পারবেন। প্রতিনিধিদের বিমানবন্দর থেকে আবাসস্থলে যাওয়ার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে পৃথক রুট, যেখানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও ‘ব্লু বুক’ প্রটোকল নিশ্চিত করা হবে।
ভিভিআইপি নিরাপত্তায় নিয়োজিত টিমগুলোকে মোবাইলফোন বা ডিজিটাল ঘড়িসহ কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহনের অনুমতি দেয়া হয়নি। এ ছাড়া, উচ্চ নিরাপত্তা এলাকাগুলোতে অননুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। রাজধানী প্রশাসন অগ্নিনির্বাপণ, এম্বুলেন্স, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, আলোকসজ্জা এবং খাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে। নিরাপত্তাজনিত কারণে ফয়সাল এভিনিউ থেকে জিরো পয়েন্ট এবং এক্সপ্রেসওয়ে থেকে কোরাল চৌক পর্যন্ত সড়ক বন্ধ রাখা হবে। প্রতিনিধিদের চলাচলের সময় বিভিন্ন সড়কে যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। রাওয়ালপিন্ডিগামী যানবাহনকে বিকল্প হিসেবে ৯ম এভিনিউ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ভারা কাহু, বানিগালা ও কোরাং রোড হয়ে চলাচলের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সর্বোপরি, ইসলামাবাদ এখন কড়া নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো, কারণ এই আলোচনাকে ঘিরে পুরো বিশ্বের দৃষ্টি এখন পাকিস্তানের দিকে।