Image description
জলাবদ্ধতা নিরসনের ৫ স্তরেই গলদ

সামনেই বর্ষা, এর আগেই রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের মনে উঁকি দিচ্ছে পানিতে হাবুডুবু খাওয়ার চিরচেনা আতঙ্ক। ক্যাচপিট (সড়কের পাশে বৃষ্টির পানি প্রবেশের পথ), ড্রেন, খাল, পাম্পিং স্টেশন এবং চারপাশের নদনদী-পানি নিষ্কাশনের এই পাঁচটি স্তরের সবখানেই এখন পাহাড়সম গলদ। ক্যাচপিট ও ড্রেনগুলো ময়লায় ঠাসা, খালগুলো দখলদারদের পেটে, নদী হারিয়েছে পানির ধারণক্ষমতা, আর বিশাল এই শহরে চাহিদার তুলনায় পাম্পিং স্টেশনের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।

বছরের পর বছর দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো কেবল আশ্বাসের ফুলঝুরি ছড়ালেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দুর্নীতির বলয় আর সমন্বয়হীনতায় আটকে থাকা এই পাঁচ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। কার্যকর কোনো মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় আগামী বর্ষায়ও একটু ভারি বৃষ্টিতেই ঢাকা শহর জলাবদ্ধতার ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, ক্যাচপিট বৃষ্টির পানি ড্রেনে যেতে সহায়তা করে। এটি ছিদ্রযুক্ত কার্পেটিং। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে থাকা এসব ক্যাচপিটের ছিদ্রগুলো আবর্জনা ও কাদামাটিতে বন্ধ হয়ে গেছে। আর ড্রেনগুলো ক্যাচপিট দিয়ে যাওয়া পানি খালে নিয়ে যায়। এই ড্রেন ও খালগুলোও আবর্জনায় ডুবে আছে। এছাড়া রাজধানীর অনেক খালই বেদখল হয়ে গেছে। এ তিনটি পর্যায় অতিক্রম করে বৃষ্টির পানি পাম্পিং স্টেশন পর্যন্ত গেলে স্লুইস গেট দিয়ে অথবা পাম্পিং করে পানি নদীতে ফেলতে হয়। বর্ষা মৌসুমে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে নদী পানিতে টইটম্বুর থাকে। এজন্য স্লুইস গেট খুলে দেওয়া যায় না। পাম্পিং করে পানি নদীতে ফেলতে হয়। সক্ষমতা কম থাকায় তখন পানি নিষ্কাশনে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তাছাড়া পাম্পিং স্টেশনেও নানা জটিলতা থাকে। সবশেষ স্তর ঢাকার চারপাশের নদনদী অর্থাৎ, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা। নানা কারণে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় বেশি পানি ধারণ করতে পারছে না। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্লুইস গেট দিয়ে পানি নিষ্কাশন করা যায়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা যায়, এ সিটির আয়তন ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনুযায়ী এখানে ১০টি পাম্পিং স্টেশন দরকার; কিন্তু আছে মাত্র ৩টি। সেগুলো হলো-কমলাপুর, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিল পাম্পিং স্টেশন। এর মধ্যে হাতিরঝিলের পাম্পিং স্টেশন অকেজো।

ডিএসসিসি সূত্রে আরও জানা যায়, ঢাকার দক্ষিণাংশে জলাবদ্ধতার বেশ কয়েকটি হটস্পট রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ঢাকা কলেজ এলাকা, নায়েম সড়ক, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, বকশিবাজার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, জুরাইন আলমবাগ, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের মিতালী স্কুল রোড, রাজারবাগ এলাকার চাঁদবাড়ি সড়ক, মুগদা প্রধান সড়ক এবং মুগদা হাসপাতালের আশপাশের এলাকা। প্রতিবছর এসব হটস্পটে নাগরিকরা হাবুডুবু খেলেও প্রশাসক বা মেয়ররা শুধু কথার ফুলঝুরি শুনিয়েছেন। বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. বোরহান উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতার সমাধান করতে হলে ক্যাচপিট, ড্রেন, খাল, পাম্পিং স্টেশন ও নদনদী পরিষ্কার এবং ধারণক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। ডিএসসিসি এলাকায় যে পরিমাণ পাম্পিং স্টেশন রয়েছে, সেটি চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এজন্য পাম্পিং স্টেশনের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। অন্ততপক্ষে ১০টি করা দরকার। তাহলে খুব দ্রুততম সময়ে পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ঢাকার পানি নিষ্কাশনের সমাধান করতে কার্যকর তেমন কোনো কাজ হয়নি। সিটি করপোরেশনের কাছে দায়িত্ব আসার পর কিছুটা কাজ শুরুর পরিকল্পনা করলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময় গেছে। এখন নতুন সরকার উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা করছে। সেসব বাস্তবায়ন হলে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।

তিনি জানান, হাতিরঝিল পয়েন্টে পাম্পিং স্টেশনে পাম্প নেই। বক্স কালভার্ট দিয়ে পানি ধীরে ধীরে যায়। সেখানে পাম্প বসালে ধানমন্ডি-২৪, গ্রিনরোডসহ আশপাশের এলাকার পানি দ্রুত সরে যাবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছু পয়েন্টে নগরবাসী জলাবদ্ধতায় নাকাল হন। এর মধ্যে রয়েছে ডিএনসিসিভুক্ত হওয়া নতুন এলাকা, বাড্ডা, ভাটারা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, হরিরামপুরসহ পুরো এলাকা। এছাড়া মিরপুর-১০, ১১, ১২, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও তালতলা, বসিলা রোড, উত্তরা-১০, ১১ ও ১২ নম্বর সেক্টরের একাংশ।

ডিএনসিসির প্রকৌশলীরা জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন নানা তৎপরতা চালায়, কিছু ক্ষেত্রে সফলতা মিললেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যায় না। তারপরও প্রশাসক বা মেয়রের নির্দেশে তারা তৎপর থাকেন। নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবের চেষ্টা চালান। এবারও তারা সে ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে টেকসই সমাধানের কার্যকর প্রস্তুতি বা উদ্যোগ নেই বলে জানান তারা।

ডিএনসিসি সূত্রে জানা যায়, এ অঞ্চলে ৩টি বড় এবং ২টি ছোট পাম্পিং স্টেশন রয়েছে। সেগুলো হলো রামপুরা, গোড়ান চটবাড়ি ও কল্যাণপুর পাম্পিং স্টেশন। এর মধ্যে গোড়ান চটবাড়ি পাম্পিং স্টেশন পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। আর ছোট পরিসরে ডিএনসিসি দুটি পাম্পিং স্টেশন পরিচালনা করে, তা হলো উত্তরা ও মিরপুর বেড়িবাঁধ পাম্পিং স্টেশন।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম যুগান্তরকে বলেন, আসন্ন বর্ষায় ডিএনসিসি এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন করতে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়াা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশাসকের নির্দেশনায় জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্পট চিহ্নিত করে সমাধানের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বর্ষায় কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) গঠন করা হয়, যারা জলাবদ্ধতা নিরসনে মাঠে সক্রিয় থাকে। ইতোমধ্যে প্রশাসক সেই টিম গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ অভিমত : ঢাকা ওয়াসার সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সহিদ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ঢাকাকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে হলে পানি নিষ্কাশন সিস্টেমকে সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এর জন্য প্রধানত দরকার আন্তরিকতা। সেটার বড় ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগী না হলে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে না। তিনি বলেন, খাল খননের কাজ সাধারণত শীতকালে করা উচিত। তাহলে এই কাজটি কার্যকর হয়। পাশাপাশি নদী খনন এবং বক্স কালভার্ট, ড্রেন ও ক্যাচপিট পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাকে সচল ও কার্যকর রাখতে হবে। এজন্য যে ধরনের কাজ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার, সেটা নিতে হবে। সেটার বড় ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ক্যাচপিট, ড্রেন, খাল, পাম্পিং স্টেশন, নদীসহ সবকিছুর বাধা দূর করতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ময়লা-আবর্জনা, খাল দখল ও ভরাট, পাম্পিং স্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নদী খনন করতে হবে। সমস্যা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কাজ করলে সমাধান মিলবে। নইলে টাকা খরচে কোনো সুফল মিলবে না।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান যুগান্তরকে জানান, তিনি কিছুদিন হলো দায়িত্ব পেয়েছেন। এরপরও বর্ষায় জলাবদ্ধতা নিরসনে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করছেন। কুইক রেসপন্স টিম-কিউআরটি গঠন করতে নির্দেশনা দিয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম যুগান্তরকে জানান, বর্ষার জলাবদ্ধতার কারণগুলো চিহ্নিত করে তা নিরসনে কাজ শুরু করেছেন। বক্স কালভার্ট, খাল ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি সেসব কঠোরভাবে তদারকি করছেন। অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে যেন বর্ষার জলাবদ্ধতা কম হয়, এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।