Image description
সংস্কার নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেল

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জনগুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেয়নি বিএনপি সরকার। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে-সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, গণভোট, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য অধিকার এবং রাজস্ব ও ব্যবস্থাপনার অধ্যাদেশ অন্যতম। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ইতোমধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে।

বাকি ১১৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি হুবহু এবং ১৬টি সংশোধিত আকারে পাশ হয়েছে। এক্ষেত্রে সংসদের এবারের অধিবেশনে মোট ৯১টি বিল পাশ হয়েছে। অর্থাৎ কোনো বিলের মধ্যে একাধিক অধ্যাদেশ রয়েছে। বিরোধী দলের দাবি, এই অধ্যাদেশগুলোর মূল কথা ছিল দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। এটি দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের আগ্রহ ছিল। কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি। ফলে সরকারি দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ এনে শেষদিনেও সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। আর এ নিয়ে এবারের অধিবেশনে বিরোধী দল মোট ৪ বার ওয়াকআউট করল।

তবে সরকার বলছে, যে অধ্যাদেশগুলো পাশ হয়নি, তা আরও গভীর যাচাই-বাছাই করে আইনে রূপ দেওয়া হবে। এবারে সংসদে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সংসদের বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, কোনো অধ্যাদেশ বাতিল হয়নি। আগামী বাজেট অধিবেশনে যাচাই-বাছাই করে এগুলো পাশ করা হবে। অর্থাৎ অধ্যাদেশ নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেল।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি কোনো ধরনের সংস্কার করছে না। সংস্কারে তাদের আগ্রহ নেই। বিরোধী দল হিসাবে সংসদে আমরা এ বিষয়ে কথা বলেছি। কিন্তু তারা আমলে নেয়নি। এ অবস্থায় রাজপথে আন্দোলন ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে-সাংবিধানিক সংস্কার, আইনি সংস্কার ও নির্বাহী আদেশ। সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য জুলাই সনদ সই করে গণভোটের মাধ্যমে তার আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়। কিন্তু নোট অব ডিসেন্টের কথা উল্লেখ করে গণভোটের সিদ্ধান্ত হুবহু বাস্তবায়ন করতে চায় না বিএনপি। দ্বিতীয়ত আইনি সংস্কারের জন্য জারি করা হয় ১৩৩টি অধ্যাদেশ। এর মধ্যে ৯৭টি সংসদে হুবহু পাশ হয়।

১৬টি সংশোধন আকারে এবং বাকি ২০টি বাতিল হয়েছে। তৃতীয়ত নির্বাহী আদেশে যে সংস্কার হয়েছে, তা যাচাই-বাছাই চলছে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদ না থাকলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংসদ কার্যকর হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে ওই অধ্যাদেশ আইনে রূপ দিতে হয়। সেই অধ্যাদেশ আইনে রূপ দেওয়া সম্ভব না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।

এক্ষেত্রে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর ১৩৩টি অধ্যাদেশ মূল্যায়নে বিশেষ কমিটি গঠন করে বিএনপি। ১৩ সদস্যের এ বিশেষ কমিটির ১০ জনই বিএনপির এবং বাকি তিনজন জামায়াতের ইসলামীর সংসদ-সদস্য। কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। বিশেষ কমিটি ১ এপ্রিল সুপারিশ জমা দিয়েছে। এতে ১৩৩টির মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাশ করতে বলা হয়েছে। ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে। বাকি ২০টির মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সংসদে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।

চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষ কমিটির সুপারিশও হুবহু আমলে নেয়নি সরকার। এক্ষেত্রে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ অধ্যাদেশ হুবহু অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল বিশেষ কমিটি। কিন্তু সরকার সেখানে সংশোধনী এনে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। সংস্কৃতিমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে এ জাদুঘরের পর্ষদের সভাপতি করা এবং জনস্বার্থে সরকারকে যে কোনো সময় যে কোনো সদস্যদের মনোনয়ন বাতিলের ক্ষমতা যুক্ত করেছে।

অধ্যাদেশ বাতিল : বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুসারে- চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এগুলো জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে ১৯৯৮ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়। কিন্তু পরের সরকারগুলো তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেনি।

সংবিধানে বিচারক নিয়োগে আইন করার কথা থাকলেও এতদিন এটা হয়নি। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করেছিল। সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগের লক্ষ্যে উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাইপূর্বক প্রধান বিচারপতি কর্তৃক রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ প্রদানের উদ্দেশ্যে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তাতে বলা হয়েছে, সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল।’

প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে। অন্যদিকে অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানসংক্রান্ত বিষয়াদি পালনের জন্য এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ করা হয়।

এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা হলে অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে এই সচিবালয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটিবিষয়ক সব সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় এই সচিবালয়ের হাতে থাকবে। সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সচিবালয়ের সচিব প্রশাসনিক প্রধান হবেন। সুপ্রিমকোর্টসংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল বিরোধী দল। কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি।

স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে যেসব অধ্যাদেশ : শেষদিন পর্যন্ত সংসদে ২০টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-গণভোট অধ্যাদেশ; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন), মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন), কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ।

সংশোধিত আকারে পাশ : সংশোধিত আকারে ১টি অধ্যাদেশ পাশ করা হয়েছে। এগুলো হলো-জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ, ২০২৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজ্যুলশন অধ্যাদেশ, সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট), জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ধূমপান ও তামাকজাতদ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধান) অধ্যাদেশ, ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ। এর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ সংশোধন করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের-মিছিল, মিটিং এবং প্রকাশনাসহ যেসব কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে।

৯৭টি হুবহু পাশ : ৯৭টি অধ্যাদেশ হুবহু পাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনসংক্রান্ত। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কিছু অধ্যাদেশ রয়েছে। যেসব অধ্যাদেশ হুবহু পাশ হয়েছে এগুলো হলো-গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যামেন্ডমেন্ড অর্ডিন্যান্স ২০২৪, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতির পিতার পরিবার সদস্যদের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাস) (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ড), জাতীয় সংসদের সীমানা নির্ধারণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ অন্যতম।