ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পরও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘লাইফলাইন’ বা জ্বালানি পরিবহণের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে স্থবিরতা কাটেনি। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৮টি জাহাজ চলাচল করলেও গত ৩ দিনে হরমুজ দিয়ে মাত্র ২৩টি জাহাজ পার হয়েছে।
এতে সংকটাপন্ন জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে আগে থেকেই টোল পরিশোধের বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এছাড়া এ টোল ক্রিপ্টোকারেন্সি বা চীনের ইউয়ানে পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা থাকায় বিষয়টি ট্রাম্পকে নতুন করে চাপে ফেলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে টোল আদায় ইস্যুতে ইরানকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর টোল আদায়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনবিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার। তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, শত্রুতামূলক আচরণ না করলে হরমুজ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ চলতে পারবে। এদিকে অনুমতি না পাওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি বলে জানা গেছে। খবর বিবিসি, এএফপি, আলজাজিরার।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেসব জাহাজ পার হবে তাদের আগে থেকেই টোল পরিশোধ করতে হবে। ক্রিপ্টোকারেন্সি বা চীনের মুদ্রা ইউয়ানে এই টোল পরিশোধ করতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি চলা পর্যন্ত এভাবে টোল আদায় করা হবে। তেলবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ ডলার করে টোল আদায় করা হবে বলে ব্রিটেনের ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন ইরানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা।
২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসাবে হরমুজ চালুর দাবি জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যা ইরান মেনেও নিয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল চলাচলের বিষয়ে ‘খুব বাজে কাজ’ করছে। বৃহস্পতিবার ট্রুথ সোশ্যালে এ প্রসঙ্গে তিনি ৩টি পোস্ট দিয়েছেন। প্রথমে তিনি বলেছেন, ‘খবর পাওয়া যাচ্ছে যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে ইরান টোল আদায় করছে। তারা যেন এটা না করে এবং যদি করেও থাকে তাহলে যেন এখনই তা বন্ধ করে।’ দ্বিতীয় পোস্টে তিনি বলেন, ‘হরমুজে চলাচলকারী জাহাজগুলোর সঙ্গে ইরান যা করছে, তা খুবই বাজে এবং অসম্মানজনক। ইরানের সঙ্গে আমাদের (যুদ্ধবিরতি) চুক্তিতে এ ব্যাপারটি ছিল না।’ তৃতীয় পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান সহযোগিতা করুক আর না-ই করুক, হরমুজ প্রণালিতে খুব শিগগিরই তেলের প্রবাহ স্বাভাবিক হবে।’
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি জাহাজগুলো থেকে ইরানের টোল আদায়ের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনবিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার।
পেরোতে পারেনি ‘বাংলার জয়যাত্রা’ : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, অনুমতি না পাওয়ায় হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা।’ প্রায় ৪০ দিন আটকে থাকার পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে ৮ এপ্রিল সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে হরমুজ প্রণালির উদ্দেশে রওয়ানা দেয় জাহাজটি। টানা প্রায় ৪০ ঘণ্টা যাত্রা শেষে শুক্রবার সকালে প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছে ইরান সরকারের কাছে পারাপারের অনুমতি চাওয়া হয়। তবে তেহরান সেই অনুমতি না দেওয়ায় জাহাজটিকে ঘুরিয়ে নিরাপদে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে জাহাজে থাকা ৩১ বাংলাদেশি নাবিক উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। জাহাজে বর্তমানে ৩৭ হাজার টন সার রয়েছে। হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার পর জাহাজটি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বন্দরে যাওয়ার কথা ছিল। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ইরানের নির্দেশ অনুযায়ী অনুমতি চাওয়া হলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কূটনৈতিকভাবে অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে জাহাজটি হরমুজের কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় শারজায় ফিরে যেতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জাহাজে থাকা ৩১ নাবিকের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত রয়েছে। জাহাজে প্রতিদিন ১৮ টন সামুদ্রিক পানি পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে ইঞ্জিন চালু রাখলে রেশনিং করে পানির ব্যবহার দৈনিক ৬ টনে নামিয়ে আনা হয়। নাবিকদের মনোবল ধরে রাখতে জনপ্রতি দৈনিক খাবারের বরাদ্দ ৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২ ডলার করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসিক বেতনের সমপরিমাণ ওয়ার অ্যালাউন্স দেওয়া হচ্ছে।