পাল্টাপাল্টি হামলা জোরদার করেছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এর মধ্যে ইরান নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল থেকে তারা অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪ এর ৯২তম ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে হামলা চালিয়েছে। এতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়। আইআরজিসির দাবি, হামলার শুরুতেই তারা একটি বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবতরণযান কেন্দ্র লক্ষ্য করে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এ ছাড়া বাহরাইনে অবস্থিত একটি রাডার সিস্টেম ড্রোন হামলায় ধ্বংস করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাতেও আঘাত হানা হয়েছে। হাইফার কাছাকাছি রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে আইআরজিসি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তেল আবিবসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এ ছাড়া আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, ইরানের আকাশে একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। ১২ ঘণ্টার মধ্যে এটি দ্বিতীয়বার এমন ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানে এখনো বড় ধরনের হামলা শুরুই হয়নি এবং ভবিষ্যতে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে আঘাত হানা হতে পারে। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে টানা হামলা-পাল্টা হামলা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক সামরিক কর্মকর্তা বরখাস্ত, পেন্টাগনে চাপা উত্তেজনা: এদিকে মার্কিন সেনাপ্রধান চিফ অব স্টাফ জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে বরখাস্ত করায় পেন্টাগনে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। যুদ্ধের মধ্যে এভাবে সেনাবাহিনীর প্রধানকে বরখাস্ত করা যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন ঘটনা। বলা হচ্ছে ইরান যুদ্ধে স্থল অভিযান নিয়ে বিরোধের কারণেই জর্জকে সরিয়ে দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তাকে বরখাস্ত করে নিজের অনুগত সামরিক কর্মকর্তাকে প্রধান করেছেন তিনি। জর্জের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করবেন আর্মির ভাইস চিফ অব স্টাফ জেনারেল ক্রিস্টোফার লানেভ। শুধু জর্জকে নয় তার সঙ্গে উচ্চপদস্থ আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছেন হেগসেথ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তা জানান, হেগসেথ একইসঙ্গে আর্মির ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড ট্রেনিং কমান্ডের প্রধান জেনারেল ডেভিড হডনে এবং আর্মি চ্যাপলেইন কর্পসের প্রধান মেজর জেনারেল উইলিয়াম গ্রিনকে সরিয়ে দিয়েছেন। আগে হেগসেথ ও জর্জের মধ্যে প্রকাশ্যে কোনো মতবিরোধের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হেগসেথ বেশ কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে আর্মির শীর্ষ আইন কর্মকর্তাকে অপসারণ এবং সেনাবাহিনীর ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ আয়োজন।
২০২৩ সালে জর্জ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। সাধারণত এ পদে মেয়াদ চার বছর হয়ে থাকে। এর আগে তিনি আর্মির ভাইস চিফ এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জর্জকে আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ড্রিসকোলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তারা একসঙ্গে প্রতিরক্ষা খাতে বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি ও অস্ত্র উন্নয়ন প্রক্রিয়া দ্রুততর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার অপসারণ পেন্টাগনের শীর্ষ নেতৃত্বে সাম্প্রতিক অস্থিরতাকে আরও তীব্র করেছে। এর আগে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল সি.কিউ. ব্রাউন, নৌবাহিনীর প্রধান এবং বিমান বাহিনীর ভাইস চিফকেও সরানো হয়েছিল। এ বিষয়ে জর্জের দপ্তর থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন স্থাপনায় হামলা: ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা কুয়েত, বাহরাইন এবং জর্ডানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে এই তথ্য জানা গেছে। ইরানি সামরিক বাহিনী জানায়, ইসফাহান ও খুজেস্তানের শিল্প ও ইস্পাত কারখানা কমপ্লেক্স এবং কারাজের বি-১ সেতুতে হামলার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকাল থেকে (ইরান) জর্ডানে অবস্থিত সন্ত্রাসী মার্কিন সেনাবাহিনীর সরঞ্জাম গুদাম, সহায়তা ও আবাসন কেন্দ্র এবং কুয়েতের আরিফজান ক্যাম্পে মার্কিন সাঁজোয়া ব্রিগেডের মেকানাইজড ব্যাটালিয়নের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।এতে আরও বলা হয়, ড্রোন ব্যবহার করে বাহরাইনের বৃহত্তম অ্যালুমিনিয়াম স্মেল্টারকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, কারণ এটি মার্কিন সামরিক শিল্পের সহযোগী হিসেবে কাজ করে।
জাতিসংঘে হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে প্রস্তাব, চীনের আপত্তি: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবে ভোট করতে যাচ্ছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। কূটনীতিকদের মতে, আজ (শনিবার) এই ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে কাউন্সিলের সভাপতিত্বকারী দেশ বাহরাইন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছে, যাতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে চীন। দেশটির জাতিসংঘ দূত ফু কং বলেছেন, এমন অনুমোদন দিলে তা অবৈধ ও নির্বিচারে শক্তি প্রয়োগকে বৈধতা দেবে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রস্তাবটি পাস করতে হলে ১৫ সদস্যের কাউন্সিলের অন্তত ৯টি দেশের সমর্থন এবং স্থায়ী ৫ সদস্য দেশের কোনোটির ভেটো না থাকা প্রয়োজন। তবে চীনের আপত্তির কারণে প্রস্তাবটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভেটো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন।