Image description
► ঝুঁকিতে পোশাক খাত ► বোরো আবাদে দুশ্চিন্তায় কৃষক ► ভাড়া বেড়েছে ট্রাক কাভার্ড ভ্যানের ► ক্ষতিগ্রস্ত সমুদ্রগামী মৎস্যজীবীরা

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা চলছে তার ঢেউ এসে পড়েছে বাংলাদেশেও। সরকারের পক্ষ থেকে দেশে তেলের বাজারে কৃত্রিম সংকটের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু পাম্পগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী মিলছে না জ্বালানি তেল। তেল সংকটে ঝুঁকিতে পড়েছে পোশাক খাত। বোরো আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে কৃষক। এরই মধ্যে বন্দর থেকে শিল্প এলাকায় পণ্য পৌঁছাতে বেড়েছে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া। তেলের কারণে সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারেননি জেলেরা। এতে প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে মৎস্যজীবীদের। সব মিলিয়ে জ্বালানির প্রভাবে চতুর্মুখী চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ায় এবং সমুদ্রে মাছ আহরণ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনীতি পড়েছে চাপের মুখে। 

ঝুঁকিতে পোশাক খাত : জ্বালানি তেলের সংকটে ভুগছে দেশের পোশাক খাত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যেসব কারখানায় উৎপাদন চালাতে তেলের ওপর নির্ভর করতে হয় তারা চাহিদার অর্ধেক তেল পাচ্ছে। আবার কেউ পাচ্ছেও না। কেউ কেউ আংশিক পাচ্ছে। এতে পোশাক উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পোশাক রপ্তানিও কমছে। ক্ষতির মুখ দেখছে পোশাক খাত। নিট পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জ্বালানি তেল সংকটের কারণে ভুগছেন দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানার মালিক। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে জ্বালানিমন্ত্রী ও বিপিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা শিল্প এলাকার কারখানাগুলোর একটি তালিকা দেব। এ কারখানাগুলোতে যাতে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হয় এর দাবি জানিয়েছি। এ পর্যন্ত ১৪১টি পোশাক কারখানার দৈনিক জ্বালানির চাহিদা পেয়েছি ৬২ হাজার লিটার। এ তালিকা আরও বাড়বে।

বোরো আবাদে দুশ্চিন্তায় কৃষক : বগুড়া প্রতিনিধি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে- বগুড়ার বিভিন্ন স্থানে গত কয়েক দিন ধরেই জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি চলছে। জ্বালানি তেলের টানাটানিতে হুমকিতে পড়েছে বোরো আবাদ। বগুড়ার সোনাতলা উপজেলা হুয়াকুয়া গ্রামের বোরো চাষি মুছো ম ল জানান, তারা চাহিদা অনুযায়ী সার পেয়েছেন। সারের কোনো সংকট নেই। তবে জ্বালানি তেলের সংকটে সেচ ব্যবস্থায় শঙ্কা দেখা দিতে পারে। ফলে বোরো ফসল উৎপাদনে ফলন কমতে পারে। একইভাবে জ¦ালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে উত্তরের জেলা গাইবান্ধাতেও। সেখােেন পেট্রোলপাম্পগুলোয় মিলছে না জ্বালানি। অনেক পাম্পই বন্ধ আছে। খোলাবাজারে তেল মিললেও তা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গাইবান্ধা সদর উপজেলার কাটিহারা গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন (৬৫) বলেন, ১ লিটার ডিজেল কিনতে হচ্ছে ১৮০ টাকা দরে। এতে চরম বিপাকে পড়েছি আমরা। তেলের দাম অস্বাভাবিকহারে বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন খরচও বাড়বে। বাড়তি দামে তেল কিনে লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা করছেন এই জেলার কৃষকরা।

বেড়েছে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া : পেট্রোলপাম্পে জ্বালানি তেল নিয়ে চলা ভোগান্তির কারণে সড়কে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা কমে  গেছে। কারণ ট্রাক-কার্ভাড ভ্যানগুলো আগে চাহিদামতো জ্বালানি নিয়ে একবারেই একটি ট্রিপ শেষ করতে পারত। কিন্তু এখন পাম্পগুলোতে চাহিদার অর্ধেক তেল পাওয়ায় আবার তেল নিতে হচ্ছে। এতে ট্রিপ শেষ করতে বেশি সময় লাগছে। ফলে সড়কে আগের তুলনায় ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যাও কম। আন্তজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী জাফর আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আগে যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গাজীপুর ও আশপাশের শিল্প এলাকায় একটি ট্রাক পণ্য পরিবহনে ২০ হাজার টাকা নিত এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার। ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এমনটি হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত সমুদ্রগামী মৎস্যজীবীরা : মার্চ মাসের বেশির ভাগ সময়ই সমুদ্রগামী ছোটবড় জাহাজগুলো জ্বালানি রেশনিংয়ের কারণে চাহিদার অর্ধেক তেল পেয়েছে। আবার সামনের মাসে ১৫ তারিখ থেকে সমুদ্রে মাছ শিকার দুই মাসের জন্য বন্ধ থাকবে। গত ২৫ মার্চ থেকে সমুদ্রগামী জাহাজগুলোর জন্য তেল সংগ্রহে রেশনিং কিছুটা শিথিল করা হলেও অনেক জাহাজই আগে থেকেই তেল সংকটের জন্য সমুদ্রে মাছ শিকারের নামেনি। এতে এসব জাহাজের মালিকসহ এর সঙ্গে জড়িতরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকের বেতন-ভাতা আটকে গেছে। সমুদ্রগামী জাহাজ গাঙচিল-১ এর চিফ অফিসার ক্যাপ্টেন নুর আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জ্বালানি খরচসহ সব মিলে একটি বড় জাহাজের সমুদ্রে মাছ শিকারে দিনে ক্ষেত্রবিশেষে ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা লাগে। মূলত এখানে তেলের খরচটাই মুখ্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আমরা একটি ট্রিপের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি পাইনি। ২৫ তারিখে রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও এপ্রিলে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে বিষয়টি মাথায় রেখে অনেকে সমুদ্রে মাছ শিকারে বের হননি। ফলে মার্চসহ আগামী দুই মাসে জাহাজের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছি। আমাদের অনেকের বেতন-ভাতাও আটকা পড়েছে।