অতিরিক্ত মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। গত বছর বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর ৯০ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ দেশে, এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই ৬৭ শতাংশ। তাই মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংকট তৈরি হলে অস্থির হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। পরিস্থিতি উত্তরণে এখনই বিকল্প শ্রমবাজার তৈরির পরামর্শ জনশক্তি রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের।
জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর তালিকায় আছে ১৬৮টি দেশ। কিন্তু এর বেশির ভাগ দেশেই বছরে হাতেগোনা কর্মী পাঠানো যাচ্ছে। পূর্ব ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়ার মতো দেশগুলোতে বিশাল চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ সেখানকার উপযোগী দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারছে না। ভাষাজ্ঞান, সংশ্লিষ্ট খাতের দক্ষতা ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে কথা হলেও প্রয়োজনীয় সুফল আসছে না। এর মধ্যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি হয়েছে আরও জটিল।
প্রায় ৩০ বছর ধরে পূর্ব ইউরোপে জনশক্তি রপ্তানি করা লোকমান শাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ইউরোপের উদীয়মান অর্থনীতির তালিকায় থাকা রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া প্রতিটি দেশেই সম্ভাবনা আছে। পশ্চিম ইউরোপ থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী চলে যাওয়ায় এসব দেশে কর্মীর ঘাটতি আছে। নির্মাণ, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আতিথেয়তা খাত ও উৎপাদন শিল্পে প্রায় এই দেশগুলোতে ৪-৫ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান সম্ভব। কিন্তু তাদের চাহিদা দক্ষ কর্মী। যেখানে মেশিনম্যান দরকার, সেখানে কার্পেন্টার পাঠালে চলবে না! তাই সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার ধরা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে এই শ্রমবাজার বাংলাদেশের কাছ থেকে নিয়ে যাচ্ছে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভারত। আসলে বাংলাদেশের গতানুগতিক কূটনীতি দিয়ে শ্রমবাজার রক্ষা করা যাবে না। তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার ধরতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। এই টাস্কফোর্সে বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, এমআইএসটি ও ট্রাস্টের মতো সংগঠনগুলোকে যুক্ত করা প্রয়োজন। এমন উদ্যোগ না নেওয়া হলে জাপান, কোরিয়ার মতো সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে বাংলাদেশ যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে এখানেও তাই হবে।
জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রাথমিকভাবে আমাদের বর্তমান শ্রমবাজারের রিস্কগুলো নিয়ে একটা মূল্যায়ন করতে হবে। এটা নিয়ে এক ধরনের ছোটখাটো গবেষণা হতে পারে। কারণ আমরা মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক বছর ধরে উত্তেজনাটা বেশি দেখছি। আর যেকোনো জায়গাতেই এটা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, নতুন জায়গায় বাজার খোঁজার জন্য একটু মনোযোগী হতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকেই সেই সুযোগ আসতে পারে। আমাদের কাছাকাছিও কিছু কিছু আছে। জাপান ইতোমধ্যেই লোকজন চাচ্ছে বিভিন্ন দেশ থেকে। এগুলো ধরার জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাটার দিকে একটু বেশি করে নজর দিতে হবে। এই সস্তা শ্রমিক মানে ,আধাদক্ষ, অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে রেমিট্যান্স আনার চিন্তা থেকে বের হতে হবে। কারণ, অদক্ষ কর্মীরা পরিশ্রম করে যা পান তা দক্ষদের তুলনায় নগণ্য। সে কারণে পাঠানো জনশক্তির সংখ্যা এবং রেমিট্যান্সের তুলনা করলে নেপাল এবং অন্য দেশগুলো তুলনায় অনেক কম। তারা অল্প কর্মী পাঠিয়েও অনেক বেশি রেমিট্যান্স আনতে পারছে। কাজেই দক্ষতার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। অদক্ষ শ্রমিক না পাঠিয়ে এখানে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আয়োজন করতে এটা খুব বেশি সময় দরকার হয় তা না। মনোযোগটা খুব দরকার বলে আমি মনে করছি। সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, নীতিগতভাবে বেশি দক্ষ শ্রমিক তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সেজন্য দীর্ঘ মেয়াদি কৌশল নিতে হবে। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরি করে পৃথিবীর নতুন বাজারে আমাদের প্রবেশ করতে হবে।