রাজধানী ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা বায়তুল মোকাররম জুয়েলারি মার্কেট ও এর আশপাশের জিপিও (জেনারেল পোস্ট অফিস) সংলগ্ন সড়ক ও ফুটপাত বহু বছর ধরেই হকারদের দখলে। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের উদ্যোগ, উচ্ছেদ অভিযান, নীতিগত ঘোষণা এবং কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এলাকাটি এখনো পুরোপুরি হকারমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার পথচারী, ব্যবসায়ী ও যানবাহন চালকদের চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে।
রাজধানীর হৃৎপি- হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল শুধু স্বর্ণালংকার ব্যবসার কেন্দ্রই নয় বরং হাজারো মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকার জিপিও সড়ক ও ফুটপাত হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় পথচারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। প্রতিদিনের এই বিশৃঙ্খলা যেন নগরবাসীর জন্য এক অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফুটপাতজুড়ে বসে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন অসংখ্য হকার। কাপড়, জুতা, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, খাবার, খেলনা, কম্বল কি নেই সেখানে! পথচারীদের জন্য নির্ধারিত ফুটপাত এখন কার্যত একটি খোলা বাজারে পরিণত হয়েছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে চলাচল করছেন যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষের দাবি, তারা যেন নির্বিঘেœ ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারেন। নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক নগরজীবন প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। বায়তুল মোকাররম জুয়েলারি মার্কেট ও জিপিও সড়কের ফুটপাত দখল সমস্যাটি শুধুমাত্র একটি এলাকার নয়, বরং পুরো ঢাকার একটি প্রতিচ্ছবি। এটি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা, যার সমাধানে প্রয়োজন আন্তরিকতা, পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে এখনই সময় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বলছেন নগরবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সমস্যা নতুন নয়। বহু বছর ধরে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কিছুদিন পরই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে সবকিছু।
সরেজমিনে দেখা যায়, বায়তুল মোকাররম মার্কেটের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে জিপিও মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে এবং ফুটপাত জুড়ে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন অসংখ্য হকার। কেউ বিক্রি করছেন পোশাক, কেউ জুতা, কেউ মোবাইল এক্সেসরিজ, কম্বল, আবার কেউ বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য। অস্থায়ী স্টল, টেবিল কিংবা মাটিতে পসরা সাজিয়ে তারা দখল করে রেখেছেন পুরো ফুটপাত, এমনকি সড়কের একাংশও। ফলে পথচারীদের চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে মানুষকে নামতে হচ্ছে মূল সড়কে। দুপুরের পর থেকে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অফিস শেষের সময় এবং বিকেলের ব্যস্ত সময়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মানুষের ভিড়, হকারদের ডাকাডাকি, যানজট সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়।
বায়তুল মোকাররম মার্কেটের ব্যবসায়ী রাসেল ইনকিলাবকে বলেন, হকারদের কারণে আমাদের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা নিয়ম মেনে ভাড়া দিয়ে দোকান চালাই। কিন্তু ফুটপাথে যারা বসে তারা কোনো নিয়ম মানে না। ক্রেতারা অনেক সময় ফুটপাত থেকেই পণ্য কিনে নিচ্ছে ফলে আমাদের বিক্রি কমে যাচ্ছে।
পথচারী শাহেদ বলেন, আমরা অফিস থেকে বের হয়ে ঠিকমতো হাঁটতেও পারি না। ফুটপাত তো নেই, সব হকারদের দখলে। বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়। শপিং করতে আসলে খুব কষ্ট হয়। বাচ্চা নিয়ে হাঁটা যায় না। হকারদের কারণে এত ভিড় থাকে যে মাঝে মাঝে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
তবে হকাররা বলছেন, তারা জীবিকার তাগিদেই এখানে বসেন। তাদের অনেকেরই দাবি, বিকল্প ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করলে তারা চরম সঙ্কটে পড়বেন।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি শুধু উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এটি একটি জটিল সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা, যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বেকারত্ব, নগর পরিকল্পনার ঘাটতি এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার। জিপিও সংলগ্ন সড়কটি একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। এখানে ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় অফিস সময়ে এই এলাকায় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব আশপাশের এলাকাতেও পড়ে। এ সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট মার্কেট বা জোন তৈরি করা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ইতোমধ্যেই সিটি কর্পোরেশন, ব্যবসায়ী ও হকারদের সমন্বিতভাবে পরিকল্পিত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত করার কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী জনকল্যাণ ও চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে ডিএসসিসি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করছে। দীর্ঘদিনের যানজট নিরসন হবে এবং পথচারীরা নিরাপদে রাস্তা পারাপার হতে পারবেন সে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।