‘সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খালি তদবির। যেসব বিষয় প্রয়োজন আছে, সেগুলো করতে হবে। কিন্তু এগুলোকেই (তদবির) যদি প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তো সমস্যা হবে।’ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর বিভিন্নজনের তদবির নিয়ে প্রকাশ্যে এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত মাসে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব।
নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনে নানামুখী তদবির শুরু হয়েছে। নেতা-কর্মী আর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন আবদার-আবেদন করতে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে জড়ো হচ্ছেন। সরকারের বয়স এক মাস হলো না এরই মধ্যে চলছে নেতা-কর্মীদের বহুমুখী আবদার। এতে অনেকটাই ‘বিব্রত’ নতুন দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। তবে প্রকাশ্যে নেতা-কর্মীদের এ নিয়ে কিছু না বলে ধৈর্য ধরে দেশের জন্য কাজ করতে বলছেন তাঁরা। ন্যায্য বিষয় থাকলে সামনের দিনগুলোতে দেখবেন বলে কেউ কেউ আশস্তও করছেন।
সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে গত কদিন দেখা গেছে, মানুষের ভিড় বেড়েছে কয়েক গুণ। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষের দিকে সাধারণ লোকের প্রবেশ ছিল না বললেই চলে। কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া আর কেউ আসত না। এখন রাজনৈতিক সরকার, তাই আবার নানামুখী কাজ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে। নেতা-কর্মীদের কথা শুনতে গেলে শুনতে হয় এটা করে দিন, সেটা করে দিন। এলাকার বিভিন্ন কাজ, কৃষি, খাদ্য, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন সেক্টরের ব্যবসা, ঠিকাদারিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়া, সারের ডিলার নিয়োগ, কনস্ট্রাকশন কাজে সম্পৃক্ত হওয়া, বিভিন্ন সেক্টরের কর্মকর্তার পদায়নের তদবির করছেন অনেকে। নিজের ছেলেমেয়ের চাকরির ব্যবস্থা, কারও মুক্তিযোদ্ধা যাচাইবাছাই বিষয়টি পুনরায় খতিয়ে দেখা, বিভিন্ন জনের নামে ভাতার ব্যবস্থা, অন্যান্য রদবদল, পুলিশের ওসি-এসআই রদবদল। নিজ এলাকায় এসিল্যান্ডের রদবদল, জলমহাল ইজারা পাইয়ে দেওয়ার আবদার নিয়ে হাজির হচ্ছেন অনেকে। এলাকার অনেক নেতা-কর্মী এবং সাবেক কিছু আমলা মাঠপ্রশাসনের কর্মকর্তা (ইউএনও, ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে) রদবদলের জন্য বিভিন্ন জনের কাছে যাচ্ছেন। অবসরে চলে গেছেন এমন কর্মকর্তাদের চুক্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে কাজ করছে একটা গ্রুপ। সরকার গঠনের পরপরই নানান তদবির শুনে অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী অনেকটাই বিরক্তও। যদিও এ নিয়ে তাঁরা নেতা-কর্মীদের বলছেন, আইনানুগ আবদার হলে করে দেওয়া হবে। এত অস্থির যেন না হয়, তাড়াহুড়া যেন না করে।
গত কয়েক কর্মদিবসে দেখা গেছে সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রীর দপ্তরে ওয়েটিং রুম ও বারান্দায় দর্শনার্থীর প্রচুর ভিড়। যারা প্রত্যেকেই এসেছেন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিজেদের সমস্যা ও আবদার জানাতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনেকে ভিড় করছেন নিজেদের মামলাগুলো দ্রুত রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করতে। অনেকে ঘুরছেন নিজের এলাকায় ওসি, এএসপি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসআই পোস্টিং করাতে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি মন্ত্রণালয়ে নিত্য ভিড় লেগে থাকছে। ডাক্তারদের অনেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানী বা ভালো জেলা শহরে যেতে ভিড় করছেন। অনেকে ভিড় করছেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) করা ডাক্তারদের প্রত্যাহার করে সেখানে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) যেন গুরুত্ব পায় তা তুলে ধরতে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারাও ঘুরছেন বিভিন্ন ভালো কলেজে, রাজধানীমুখী কলেজগুলোতে পদায়নের জন্য। জনপ্রশাসনে বর্তমান কর্মকর্তাদের চেয়ে সাবেকদের ভিড় বেশি। তাঁরা অবসর থেকে ফিরে চুক্তিতে নিয়োগ চাচ্ছেন। যাঁরা ওএসডি আছেন তাঁরা পদায়নের কথা বলে যাচ্ছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকারসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়েও ভিড় দেখা গেছে।
সম্প্রতি কয়েকটি জেলায় ঘূর্ণিঝড় হওয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে এসব জেলার এমপিরা ডিও লেটার দিচ্ছেন বরাদ্দের জন্য। অনেকে এসে সরাসরি কথা বলে যাচ্ছেন মন্ত্রীর সঙ্গে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ভিড় আরও বেশি। দলের মহাসচিব হিসেবে নেতা-কর্মীরা সাক্ষাৎ করতে আসছেন, আবার নিজ এলাকার উন্নয়নে বরাদ্দ চাওয়া রাস্তাঘাট নিয়ে নানান তদবির করছেন। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ‘আমরা যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে চাই।’ তবে অনেক কর্মকর্তা বলছেন, যোগ্যতা ও দক্ষতা মুখে মুখে বলা হলেও বাস্তবে সেটি নেই। কানকথা শুনে যোগ্য লোকদের নানাভাবে ট্যাগিং করা হচ্ছে, অযোগ্যদের বিভিন্ন স্থানে পদায়ন হচ্ছে।
বিশেষ করে ইউএনও পদায়ন উদাহরণ দিয়ে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, একটি দুটি করে ইউএনও অর্ডার এর আগে জনপ্রশাসনে দেখা যায়নি। যাদের তদবির আছে তাদের বিভিন্ন বিভাগে সিঙ্গেল অর্ডার হচ্ছে। এটা ভালো ফল দেবে না বলেও মত প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। এ ছাড়া সচিবদের দপ্তরেও দর্শনার্থীর চাপ প্রচুর। সচিবালয়ে প্রবেশের পাস আগের চেয়ে সীমিত থাকলেও প্রতিদিনই বিস্তর মানুষ প্রবেশ করছেন। যুগ্মসচিব একটি, অতিরিক্ত সচিব দুটি এবং সচিবরা তিনটি করে পাস দিতে পারেন। এ ছাড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঁচটি করে প্রবেশ পাস ইস্যু করা যায়। কিন্তু অনেক সময় প্রবেশ পাসের নির্ধারিত কোটা শেষ হলেও আগত দর্শনার্থীরা নানাভাবে প্রবেশ গেট ম্যানেজ করে প্রবেশ করছেন সচিবালয়ে। একবার প্রবেশ করতে পারলে এক মন্ত্রণালয় থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ে দিনভর ছুটে বেড়াচ্ছেন নানান আবদার নিয়ে। তবে নতুন ১ নম্বর ভবনে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী অফিস করেন, এ ভবনে প্রবেশ করতে পারেন না দর্শনার্থীরা।
জানা যায়, ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী সচিবালয়ে এসব তদবিরকারীর বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকলেও রাজনৈতিক সরকারের আমলে বরাবরই এটা উপেক্ষিত হয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও দৌরাত্ম্য ছিল তদবিরকারীদের। সরকার গঠনের পর নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কয়েক দিন কেটেছে ফুলেল শুভেচ্ছাবিনিময় আর পরিচিত হতেই। নানাজন ফুল নিয়ে হাজির হতেন শুভেচ্ছা জানাতে। ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা এবার নানান কাজের আবদার নিয়ে আসছেন। তদবির করতে এসে অনেক নেতা-কর্মী দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর ধরে নানাভাবে বঞ্চনা আর মিথ্যা মামলায় পারিবারিকভাবে নিঃস্ব হয়ে গেছেন এসব প্রসঙ্গ তুলছেন। লম্বা সময় নিয়ে স্মৃতিচারণা করছেন। এজন্যই এখন তাঁদের নানামুখী কাজে সরকারের সহযোগিতা চাচ্ছেন। তাঁদের তদবিরে মন্ত্রী যেন ইতিবাচক সাড়া দেন, সেই অনুরোধ করছেন অনেকে।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে এক প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘তদবির অনেক এটা সত্য। মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যেই নেতা-কর্মীদের কথা শুনতে হয়। হয়তো সবার কাজ করে দিতে পারব না বা আইনগত না হলে করাও যায় না। তবে তাঁদের সঙ্গে ভালো কথা না বললে বা তাঁদের কথা না শুনলে তাঁদেরও কষ্ট হয়। তবে এত এত লোককে সময় দিতে হয়, কখনো বিরক্তি আসে এটাও ঠিক; কিন্তু আমরা দায়িত্ব পেয়েছি বলেই তো আমাদের কাছে আসেন।’ দলের মহাসচিব তদবির নিয়ে মন্তব্যও করেছেন উল্লেখ করলে ওই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কাছে দিনে যে পরিমাণ লোক আসে আর উনি মন্ত্রীর বাইরেও দলের মহাসচিব, সবারই তো একটা ব্যস্ততা থাকে।’ মন্ত্রিসভার আরেক সদস্য বলেন, ‘মন্ত্রী হয়েছি সবার প্রত্যাশাও বেড়েছে। নিজের এলাকার মানুষসহ অন্য এলাকার পরিচিত, নেতা-কর্মীরা আসছেন এটা স্বাভাবিক। আমরাও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জেনে নিচ্ছি মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মের ধরন। জনগণের জন্যই যেহেতু রাজনীতি তাই ন্যায়সংগত হলে চেষ্টা করি।’
সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে এলাকার মানুষ আসে আসবেই, এতে এলাকায় নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে হলেও অনেক কাজ করতে হয়। তবে সব ধরনের তদবির নিরুৎসাহ করা দরকার। যদি কেউ কোনো ধরনের বঞ্চনার প্রতিকারের আশায় অভিযোগ নিয়ে আসেন সেটি দেখতে হবে। কিন্তু তদবিরের নামে কেউ যেন বিশেষ সুবিধা না পান।’ জানা গেছে, নতুন সরকার গঠনের আগে অন্তর্বতী সরকারের ১৮ মাসের শেষের কয়েকটি দিন বাদে বাকি সময় তদবিরে তটস্থ থাকতেন ওই সময়ের উপদেষ্টারাও। ওই সময় তদবির নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন একাধিক উপদেষ্টা।