Image description

আবদুল লতিফ মাসুম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু ঘটনা শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের সহিংসতা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা রাষ্ট্রের চরিত্র, ক্ষমতার ব্যবহার এবং ন্যায়বিচারের ধারণাকে দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাবিত করে। ২০১৩-এর শাপলা চত্বর ঘটনা তেমনই একটি বহুমাত্রিক অধ্যায়, যা একদিকে স্মৃতির ভেতরে বেদনার ছাপ রেখে গেছে, অন্যদিকে ন্যায়বিচার ও সত্য অনুসন্ধানের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে ঢাকার মতিঝিলে সংঘটিত এ ঘটনা আজও ইতিহাস, রাজনীতি ও মানবাধিকার বিশ্লেষণের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। কারণ এর ব্যাখ্যা একরৈখিক নয়, বরং বহুবচন।

 

এ ঘটনাকে বোঝার জন্য প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো—‘ন্যারেটিভের দ্বন্দ্ব’। অর্থাৎ একই ঘটনা ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান। রাষ্ট্রীয় বয়ান, বিরোধী বয়ান, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে এখানে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি ঘটনাটিকে মৃত্যুহীন বলে দাবি করেন, তা শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি প্রতিরক্ষামূলক ভাষ্য। অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো—যেমন : Human Rights Watch ও Odhikar—তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, সেখানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এবং তা তদন্তের দাবি রাখে। এই দ্বৈত বয়ান আমাদের মনে করিয়ে দেয় মিশেল ফুকো-এর সেই তত্ত্ব, যেখানে তিনি বলেন, ‘Truth is not outside power, or lacking in power… truth is produced by power.’ অর্থাৎ—‘সত্য কখনোই ক্ষমতার বাইরে অবস্থান করে না; বরং ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেই তা উৎপন্ন ও নিয়ন্ত্রিত হয়।’

শাপলা চত্বরের ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংখ্যার অনিশ্চয়তা। কতজন নিহত হয়েছিল—এই প্রশ্নটির নির্ভরযোগ্য ও সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর আজও অনুপস্থিত। বিভিন্ন সূত্রে ১০-১২, ৫০-৬০, ৬১ কিংবা তারও বেশি সংখ্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। পরিসংখ্যানগত এই বিভ্রান্তি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন, যেখানে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত, মিডিয়া সীমাবদ্ধ এবং স্বাধীন তদন্তের সুযোগ সীমিত। হান্না আরেন্ডট তার ‘Truth and Politics’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন, ‘The deliberate falsehood deals with contingent facts… and this is precisely what makes it so dangerous.’ অর্থাৎ—‘যখন তথ্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয়, তখন তা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গভীর বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’ শাপলা চত্বরের ঘটনার ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের ‘State Violence’ বা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ধারণাটি বিবেচনা করতে হবে। ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘The state is the entity that claims the monopoly of the legitimate use of physical force.’ অর্থাৎ—‘রাষ্ট্রই বৈধভাবে বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার রাখে’। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বল প্রয়োগের সীমা কোথায়? কখন তা বৈধ, আর কখন তা দমন-পীড়নে পরিণত হয়? শাপলা চত্বরের ঘটনায় গভীর রাতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে, মিডিয়া কভারেজ বন্ধ রেখে এবং ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। এ অভিযোগ সত্য হলে ওয়েবারের Ôlegitimate forceÕ ধারণার সীমা অতিক্রম করে ‘excessive force’-এ রূপ নেয়।

শাপলা-হত্যাকাণ্ড

 

এই প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ‘proportionality’—অর্থাৎ ‘কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবহৃত শক্তি অবশ্যই পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে’। United Nations-এর ‘Basic Principles on the Use of Force and Firearms by Law Enforcement Officials’ অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বদা ন্যূনতম প্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ করতে হবে এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে শুধু চূড়ান্ত প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে। শাপলা চত্বরের ঘটনায় এই নীতিগুলো কতটা অনুসরণ করা হয়েছিল—সেটিই আজকের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ঘটনাটির আরেকটি গভীর মাত্রা হলো ‘culture of impunity’ বা বিচারহীনতার সংস্কৃতি। দীর্ঘ সময় ধরে এ ঘটনার কোনো নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিচার হয়নি—এটি শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব একবার বলেছিলেন, ‘Impunity anywhere is a threat to justice everywhere.’ অর্থাৎ—কোথাও বিচারহীনতার ঘটনা ঘটলে সেটা সর্বত্রই ন্যায়বিচারের জন্য একটি হুমকি। শাপলা চত্বরের ঘটনাও সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ, যেখানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত ।

তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন করে এ ঘটনার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। International Crimes Tribunal-এর তদন্তে কিছুসংখ্যক নিহতের প্রমাণ পাওয়ার দাবি সামনে এসেছে। যদিও এই প্রক্রিয়া এখনো চলমান, তবু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—বিলম্বিত বিচার কি কার্যকর বিচার? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা জন রলস—এর ন্যায়বিচার তত্ত্বের দিকে তাকাতে পারি, যেখানে তিনি বলেন, ‘Justice is the first virtue of social institutions.’ অর্থাৎ—ন্যায়বিচার হলো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি। যদি সেই ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়, তবে তা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাকেও দুর্বল করে।

শাপলা চত্বরের ঘটনাটি একইসঙ্গে একটি জাতি কীভাবে তার অতীতকে স্মরণ করে, কীভাবে তা ব্যাখ্যা করে—এটিও একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দিকে নিয়ে যায়। এখানে ‘collective memory’ বা সমষ্টিগত স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মরিচ হালবওয়াক্স তার তত্ত্বে দেখিয়েছেন, স্মৃতি কখনো ব্যক্তিগত নয়; বরং তা সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে নির্মিত হয়। শাপলা চত্বরের ঘটনাও ঠিক তেমন—এটি বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন স্মৃতিতে ভিন্নভাবে উপস্থিত।

একই সঙ্গে এ ঘটনাটি আমাদের মরিচ হালবওয়াক্স ধারণার কথাও মনে করিয়ে দেয়—যেখানে একটি সমাজ অতীতের সহিংসতা ও অন্যায়ের বিচার করে ভবিষ্যতের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকা, রুয়ান্ডা কিংবা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এ ধরনের প্রক্রিয়া দেখা গেছে। বাংলাদেশেও যদি শাপলা চত্বরের ঘটনার একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হয়, তবে তা শুধু একটি ঘটনার বিচার নয়; বরং একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথ খুলে দিতে পারে।

শাপলা চত্বরের সেই রাত আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যায়—রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যখন রাষ্ট্র এই ভারসাম্য হারায়, তখন তার প্রতিক্রিয়া শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়; বরং তা দীর্ঘ মেয়াদে সমাজের ওপর প্রভাব ফেলে।

‘শাপলার বেদনা-বিধুর স্মৃতি’ তাই শুধু অতীতের একটি অধ্যায় নয়; এটি বর্তমানের একটি প্রশ্ন এবং ভবিষ্যতের একটি সতর্কবার্তা। আর ‘নিভৃত বিচারের বাণী’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্য ও ন্যায়বিচার হয়তো বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু তা অনিবার্য। ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়গুলো শেষ পর্যন্ত আলোয় আসে এবং সেই আলোই একটি জাতিকে তার ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সেন্সরশিপ ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে এ ঘটনার প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ও ভয়াবহতা জনসমক্ষে আসতে পারেনি। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই ট্র্যাজেডি নিয়ে নতুন করে সত্য প্রকাশের পথ উন্মোচিত হয়েছে। হেফাজত নেতারা বলেন, ৫ মের গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাসহ ৫৪ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে করা মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে শাপলার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর দাবি জানান। ২০১৩ সালের ৫ মের গণহত্যার প্রতিবাদে সবাই মাঠে নামলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বড় হত্যাকাণ্ড (ম্যাসাকার) দেখতে হতো না বলে বিবৃতিতে আক্ষেপ প্রকাশ করা হয়। নেতারা বলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা, ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলারদের উসকানি ও সুশীল সমাজের বড় অংশের নীরবতার মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটতে পেরেছিল বলে তারা মনে করেন। হেফাজতে ইসলামের এই বক্তব্যের বিপরীত বার্তাও আছে। ওই সময়ের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হেফাজতে ইসলামের প্রধান আল্লামা শফীকে শাপলা চত্বরে আসতে দেওয়া হয়নি। তাকে সেদিন সন্ধ্যায় বিমানযোগে চট্টগ্রাম পৌঁছে দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বের দৃঢ়তা থাকলে চিত্র ভিন্ন ধরনের হতে পারত। পরবর্তীকালে সরকারের সঙ্গে হেফাজত নেতৃত্বের আপসকামিতা এবং তথাকথিত ‘কওমি জননী’ খেতাব আলেম সমাজের ওই সময়ের দৃঢ়তা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিপরীত বার্তা দেয়। হেফাজতের মূল্যায়নে যে রাজনৈতিক অনৈক্যের কথা বলা হয়েছে, তার ব্যর্থতা হেফাজতের গায়েও লাগে। মনে আছে, খালেদা জিয়া বিবৃতি দিয়ে নেতাকর্মীদের শাপলা চত্বরে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বলা হয়, জামায়াতের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আন্দোলনের রাজনীতিকীকরণ হতে পারে—এই ভীতি ছিল। তবে স্বনামে-বেনামে জামায়াত-শিবিরের অংশগ্রহণ ছিল দৃশ্যমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরো মনে করেন, তখনকার বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, অর্থাৎ—খালেদা জিয়া হেফাজতের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। যথার্থ সমন্বয়ের অভাবে খালেদা জিয়ার নির্দেশনা সত্ত্বেও আন্দোলন সফল হয়নি। সেই ব্যর্থতার দায়-দায়িত্ব সবার। এখন ওই হত্যাযজ্ঞের বিচার নিশ্চিত করা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও সরকারের অবশ্য কর্তব্য। আর হেফাজত নেতাদের কর্তব্য বিভেদ নয়, জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করা। তাহলেই ইসলামের হেফাজত এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত হবে।

 

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়