ফুটবলে কখনো একটি গোল পুরো ইতিহাস বদলে দেয়। কখনো একটি সেভ। কখনো একটি পেনাল্টি। আর কখনো ইতিহাস আটকে যায় এক হাতে। ২০১০ সালের ২ জুলাই, জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে ঘানা ও উরুগুয়ের কোয়ার্টার ফাইনাল ছিল তেমনই এক রাত।
আফ্রিকার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ, আফ্রিকার শেষ প্রতিনিধি ঘানা, সামনে সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্নের দরজা। যে দরজা দিয়ে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে ছিল ব্লাক স্টারসরা। তারপর লুইস সুয়ারেজের সেই বিতর্কিত হাত, আসামোয়া জিয়ানের পেনাল্টি, আর এক মহাদেশের নিঃশ্বাস থেমে যাওয়ার মুহূর্ত।
স্কোরলাইন বলবে, ম্যাচটি ১-১ ড্র হয়েছিল, টাইব্রেকারে উরুগুয়ে জিতেছিল ৪-২ ব্যবধানে। কিন্তু এই ম্যাচকে শুধু স্কোরলাইন দিয়ে বোঝা যায় না। কারণ এটি ছিল ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন নৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি: নিয়ম ভেঙে নয়, নিয়মের ভেতর থেকেই কি কেউ ইতিহাস চুরি করতে পারে?
দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০ ছিল আফ্রিকার বিশ্বকাপ। কিন্তু গ্রুপ পর্ব ও নকআউটের ধাক্কায় একে একে বিদায় নেয় মহাদেশের দলগুলো। শেষ পর্যন্ত ঘানাই হয়ে ওঠে আফ্রিকার আশা। শুধু নিজের দেশের নয়, পুরো মহাদেশের। প্রতিটি আক্রমণে ছিল ঘানার রং, প্রতিটি সেভে ছিল আফ্রিকার চিৎকার, প্রতিটি জিয়ান-দৌড়ে ছিল নতুন ইতিহাসের সম্ভাবনা।
ম্যাচের প্রথমার্ধের শেষ দিকে সুলে মুনতারির দূরপাল্লার শটে এগিয়ে যায় ঘানা। উরুগুয়ের হয়ে দ্বিতীয়ার্ধে সমতা ফেরান দিয়েগো ফোরলান। ১-১ স্কোরে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। তখনও বোঝা যাচ্ছিল না, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত শেষ দৃশ্যগুলোর একটি অপেক্ষা করছে সবার জন্য।
অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্ত। ঘানার আক্রমণ। উরুগুয়ের বক্সে বিশৃঙ্খলা। বল গোললাইন পেরোতে যাচ্ছে। প্রথমে শরীর, তারপর মরিয়া প্রতিরোধ, শেষে সুয়ারেজ হাত দিয়ে বল ঠেকালেন। ফুটবলের নিয়মে সেটি অপরাধ। রেফারি লাল কার্ড দেখালেন, ঘানাকে পেনাল্টি দিলেন। সুয়ারেজ মাঠ ছাড়লেন। ঘানা পেল সেমিফাইনালে ওঠার সবচেয়ে সরাসরি সুযোগ।

সেই মুহূর্তে সুয়ারেজ যেন ভিলেন। ঘানার কাছে, আফ্রিকার কাছে, নিরপেক্ষ দর্শকের বড় অংশের কাছেও। কিন্তু উরুগুয়ের কাছে? তিনি ছিলেন শেষ মানুষ, যে হেরে যাওয়ার আগে হার মানেনি। এখানেই ঘটনাটির জটিলতা। তিনি গোল আটকেছেন অবৈধভাবে, শাস্তি পেয়েছেন নিয়ম অনুযায়ী, কিন্তু সেই শাস্তির পরও ঘানাকে গোল করতে হতো। আর সেই গোলের দায়িত্ব এসে পড়ল আসামোয়া জিয়ানের কাঁধে।
জিয়ান দাঁড়ালেন পেনাল্টি স্পটে। সামনে ফার্নান্দো মুসলেরা। পেছনে এক মহাদেশের অপেক্ষা। এটি শুধু একটি পেনাল্টি ছিল না। এটি ছিল আফ্রিকার প্রথম বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের দরজা। শট নিলেন জিয়ান। বল উঠে গেল। ক্রসবারে লেগে ফিরে এল।
সেই শব্দ শুধু একটি বারপোস্টে লাগা বলের শব্দ ছিল না। সেটি ছিল এক স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার শব্দও।
কয়েক সেকেন্ড আগেও যে ঘানা ইতিহাসের সবচেয়ে কাছে ছিল। কয়েক সেকেন্ড পরে তারা দাঁড়িয়ে গেল টাইব্রেকারের অনিশ্চয়তায়। ফুটবলে মানসিক আঘাত কখনো স্কোরবোর্ডে দেখা যায় না, কিন্তু খেলোয়াড়ের চোখে দেখা যায়। জিয়ানের চোখে দেখা যাচ্ছিল। ঘানার শরীরী ভাষায় দেখা যাচ্ছিল। আফ্রিকার গ্যালারিতে দেখা যাচ্ছিল।
তারপরও জিয়ান সাহস দেখিয়েছিলেন। টাইব্রেকারে আবার পেনাল্টি নিতে এসে তিনি গোল করেন। কিন্তু ততক্ষণে ম্যাচের আবেগ বদলে গেছে। উরুগুয়ে টাইব্রেকারে জিতে যায়। শেষ পেনাল্টিতে সেবাস্তিয়ান আব্রেউর পানেনকা শট উরুগুয়েকে সেমিফাইনালে পাঠায়, আর ঘানাকে পাঠায় বিশ্বকাপের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতির ভেতর।

এই ম্যাচের সৌন্দর্য, কিংবা অস্বস্তি, এখানেই যে একে সাদা-কালো করে দেখা কঠিন। সুয়ারেজ কি প্রতারক? নাকি তিনি তাঁর দলের জন্য শেষ সম্ভাবনাটুকু কিনে দিয়েছিলেন? ঘানা কি অন্যায়ের শিকার? নাকি তারা পেনাল্টি পেয়েছিল, সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু শেষ করতে পারেনি? ফুটবলের সবচেয়ে বড় নাটকগুলো এমনই, যেখানে উত্তর যত সহজ মনে হয়, তত সহজ থাকে না।
ঘানার জন্য এটি ছিল জাতীয় বেদনা। আফ্রিকার জন্য ছিল অপূর্ণ মহাকাব্য। ১৯৯০ সালে ক্যামেরুন কোয়ার্টার ফাইনালে থেমেছিল। ২০০২ সালে সেনেগালও শেষ আটে থেমেছিল। ২০১০ সালে ঘানা ছিল সেই সীমা ভাঙার সবচেয়ে কাছে। কিন্তু আফ্রিকার প্রথম সেমিফাইনাল বারপোস্টে লেগে ফিরে আসে।
সুয়ারেজ পরদিন থেকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্রগুলোর একজন হয়ে ওঠেন। কারও কাছে তিনি অপরাধী, কারও কাছে বুদ্ধিমান, কারও কাছে নির্মম বাস্তববাদী। কিন্তু ঘানার কাছে তাঁর হাত শুধু একটি হ্যান্ডবল নয়, একটি স্থায়ী ক্ষত। ২০২২ বিশ্বকাপে ঘানা ও উরুগুয়ে আবার মুখোমুখি হলে সেই ২০১০-এর স্মৃতি আবার ফিরে এসেছিল। এত বছর পরও বোঝা গেছে, জোহানেসবার্গের সেই রাত শেষ হয়নি।