পশ্চিমবঙ্গে এবারের ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পশু জবাই এবং উৎসব উদযাপনের নিয়মে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন আনা হয়। এ বছর পশ্চিমবঙ্গে ঈদে আগের মতো আনন্দ বা উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি।
ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিবছর কলকাতার ঐতিহাসিক রেড রোডে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হলেও এবার তা হয়নি। নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেড রোডে ঈদের নামাজ বন্ধ করে দেয় এবং তার বদলে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে। নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করে।

কুরবানির ক্ষেত্রেও এবার অভূতপূর্ব কড়াকড়ি দেখা গেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেই ১৯৫০ সালের পশুহত্যা সংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে কার্যকর করেছে। এই আইন অনুযায়ী, প্রশাসনের পূর্বানুমোদন ছাড়া গবাদি পশু হত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিজেপি সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে দেশটি সুপ্রিম কোর্টও বলেছে, গরু কোরবানি কোনো ধর্মীয় উৎসবের অপরিহার্য অংশ নয় এবং জনসমক্ষে বা খোলা জায়গায় গরু ও মহিষসহ যেকোনো পশু জবাই করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগে যেখানে রাস্তাঘাটে বা মাঠে গরু জবাই করা হতো, এবার তা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয় এবং কুরবানির পশু নিজ নিজ ঘরের বা নির্দিষ্ট এলাকার ভেতরে সম্পন্ন করার কড়া নির্দেশনা ছিল। এসব নিয়মকানুন ও প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে কুরবানির ঈদের আগে রাজ্যের গরুর হাটগুলো প্রায় ফাঁকাই ছিল এবং বেচাকেনায় ব্যাপক ভাটা পড়ে।

উৎসবের এই দিনে রাজনৈতিক সৌজন্যের ক্ষেত্রেও এক বিরাট পরিবর্তন দেখা গেছে। অন্যান্য বছরগুলোতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতি বছর রেড রোডে ঈদের নামাজে নিজে উপস্থিত থাকতেন। কিন্তু এবার ঈদ উৎসব উপলক্ষে রাজ্য সরকার, বিজেপি সরকার তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষ থেকে কোনো শুভেচ্ছা জানানো হয়নি, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতেও তিনি কোনো শুভেচ্ছাবার্তা দেননি। এর পরিবর্তে, ঈদের দিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মায়াপুরের ইস্কনে গিয়ে সারাদিন 'গো-সেবা' করেন এবং সেই সমস্ত ভিডিও নিজের ফেসবুকে পোস্ট করেন।

এই সমস্ত কড়াকড়ি ও পরিবর্তনের প্রভাব সাধারণ মানুষের আবেগে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে এই হতাশা ও যন্ত্রণার চিত্র ফুটে উঠেছে। মানসারুল হক নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা যায়, ঈদের দিন ঈদগাহের ময়দানে মানুষের চোখে পানি ছিল এবং লাখ লাখ পরিবার এই বছর কুরবানি থেকে বঞ্চিত হওয়ায় বাড়ির শিশুদের কান্নার সঙ্গে ঈদের মোনাজাত মিশে গিয়েছিল। রাজ্যের প্রায় ৩ কোটি মুসলমানের পাশে কেউ ভরসা জোগাতে আসেনি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করা হয়েছে ওই পোস্টে। এই পরিস্থিতিকে 'সংখ্যাগুরুর ফ্যাসিজম' বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ওই পোস্টে এমন দৃঢ় আশাও ব্যক্ত করা হয়েছে যে, কামাল আতাতুর্কের ভূমিতে যেমন কুরবানি ফিরেছে, তেমনি ভবিষ্যতে তিতুমীরের এই পবিত্র ভূমিতেও সমস্ত সম্মানের সঙ্গে আবারো কোরবানি ফিরে আসবে এবং শিশুদের মুখে হাসি ফুটবে।