ভারতের দিল্লিতে পর্তুগালের ভিসা নিতে গিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান। তবে দ্রুতই তিনি ভারতীয় গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে যান। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিসা বাতিল করে তাকে ভারত থেকে ফেরত পাঠানো হয়। এমনকি পর্তুগালের ভিসা সেন্টারে তাকে দ্বিতীয়বার যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাহদী ভারত ছাড়ার আগে বিমানবন্দরে জেরা করা হয়েছে। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘ভারত-বিরোধী কথা বলে এবং বাংলাদেশের এক হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার প্রকাশ্য দাবি করে—এমন কোনো ব্যক্তিকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না। তাকে এটাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নিজের দেশেই ফিরে যাওয়া ছাড়া তার অন্য কোনো উপায় নেই।’
গত বুধবার বিকেলে মাহদী হাসান বাংলাদেশে ফিরেছেন। মাস খানেক আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর কারণে তাকে নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে প্রকাশ্যেই তিনি ওসি আবুল কালামকে হুমকি দিচ্ছেন এই বলে যে, তারা বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছেন এবং এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন।
এই বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মুখে গত জানুয়ারিতে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে তার সমর্থকদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তাকে মুক্তি দেওয়া হলে তা নিয়েও হয় সমালোচনা।
সম্প্রতি তিনি দিল্লিতে গিয়েছিলেন পর্তুগালের ভিসা নিতে। সেখানেই তাকে কেউ একজন চিনে ফেলে এবং একটি ভিডিও রেকর্ড করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এরপরই সক্রিয় হয়ে ওঠেন ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
ওই কর্মকর্তারা মঙ্গলবার ও বুধবার তার ওপর কীভাবে নজর রেখেছিলেন এবং শেষমেশ তার সঙ্গে ঠিক কী কী করা হয়েছে, তা জানতে পেরেছে বিবিসি বাংলা।
এমন দুজন ব্যক্তির সঙ্গে বিবিসি বাংলা পৃথকভাবে কথা বলেছে, যারা গোটা ঘটনাক্রম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।
অবশ্য তাদের নাম উল্লেখ করা হবে না—এই শর্তেই বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন তারা।
তারা দুজনেই বলেছেন যে, মাহদী হাসানকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা হয়নি কোথাও। তবে এটা তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘ভারত-বিরোধী কথা বলে এবং বাংলাদেশের এক হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার প্রকাশ্য দাবি করে—এমন কোনো ব্যক্তিকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না। তাকে এটাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নিজের দেশেই ফিরে যাওয়া ছাড়া তার অন্য কোনো উপায় নেই।’
ওই দুইজনের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই প্রতিবেদন করে বিবিসি।
দিল্লির প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেসে একটি বেসরকারি সংস্থার দপ্তরে মঙ্গলবার সকালে প্রথম দেখা যায় মাহদী হাসানকে। তার পাশে এক নারীও বসেছিলেন। ওই বেসরকারি সংস্থাটি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের হয়ে ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করে থাকে।
জানা গেছে, মাহদী এবং তার পাশে বসা নারী পর্তুগালের ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলেন।
পর্তুগালের ভিসা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের দিল্লিতে আসতে হয়; সে জন্য ভারতীয় ভিসা লাগে। জানা গেছে, বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাস মাহদী হাসানকে ভিসা দিয়েছিল।
মাহদী এবং তার সঙ্গে আসা নারী নিউ দিল্লি রেলস্টেশনের কাছাকাছি পাহাড়গঞ্জ এলাকার একটি হোটেলে ওঠেন বলে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে।
কনট প্লেসের ওই ভিসা কেন্দ্রে অপেক্ষা করার সময়ে কেউ তার ভিডিও রেকর্ড করে নেয়। সেই ব্যক্তি কে, সেটা কেউ জানাতে চাননি। তবে তিনি যে মি. হাসানকে চিনতে পেরেছিলেন, এটি নিশ্চিত।
ভিডিও রেকর্ডকারী ব্যক্তিও সেখানে ভিসা নিতেই গিয়েছিলেন। তবে তিনি পর্তুগালের জন্য নয়, অন্য কোনো দেশের ভিসার আবেদন করতে গিয়েছিলেন বলে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে।
একটি সূত্র বিবিসি বাংলাকে জানায়, ‘মঙ্গলবার সকাল ১১টা নাগাদ মাহদী হাসানকে চিহ্নিত করা যায়। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে খবর পেয়ে যাই। সেই সময়েই পরপর তার কাছে ভারতীয় ও বাংলাদেশের নানা নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করে। সেই সব ফোন কারা করছিল, সেটা বলব না। কিন্তু তখনই মাহদী হাসান আন্দাজ করে যে কোথাও একটা গণ্ডগোল হয়েছে।’
‘একটি নতুন দেশে এসে, যেখানে তাকে কেউ চেনে না—তার কাছে হঠাৎ করে কেন এত অজানা নম্বর থেকে ফোন আসবে? এটি তাকে চিন্তায় ফেলে দেয়। অন্যদিকে কর্মকর্তারা তার ওপর নজর রাখা শুরু করেন।’
অন্য সূত্রটি বলেছে, ওই ভিসা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে মাহদী প্রথমে পুরোনো দিল্লির জামা মসজিদ এলাকায় গিয়েছিলেন।
সূত্রটি বলছে, ‘বেলা দুটো থেকে আড়াইটার মধ্যে তাকে বাংলাদেশ থেকে কেউ জানায় যে সে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তখন সে নিশ্চিত হয় যে অজানা নম্বরগুলো থেকে কারা, কেন ফোন করছিল। এরপরই সে দিল্লিতে কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিল আশ্রয়ের সন্ধানে। কেউই তাকে থাকতে দিতে রাজি হয়নি।’
বিবিসি বাংলা যে দুজনের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের একজন জানিয়েছেন, মাহদী দিল্লি থেকেই ভিসা নিয়ে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার সঙ্গে যে নারী ছিলেন, তিনি মাহদীর এক আত্মীয়া।
ওই সূত্রটিই বলেছে যে, পরবর্তী সময়ে খরচের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে ভারতে এসেছিলেন মাহদী হাসান, যার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় ৪০ লাখেরও বেশি।
তবে অন্য সূত্রটি ‘এটা আমার এখতিয়ারে পড়ে না’ বলে অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে কিছু জানাতে পারেননি। তিনি এটাও নিশ্চিত করতে পারেননি যে মাহদী দিল্লি থেকেই লিসবনে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন কি না।
তবে মাহদীকে কেউ পরামর্শ দেন যে তিনি যেন পাহাড়গঞ্জের হোটেল থেকে সরে যান এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি কোনো হোটেলে ওঠেন।
পাহাড়গঞ্জের হোটেল থেকে কাউকে দিয়ে তিনি নিজের ব্যাগ-সুটকেস আনিয়ে বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি হোটেলে ওঠেন মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।
দিল্লি-ঢাকা ইন্ডিগোর বিমানের টিকিট তাকে পৌঁছে দেওয়া হয় রাতেই।
একদিকে মাহদী হাসানের ওপর নজর রাখা যেমন চলছিল, অন্যদিকে ভারতীয় কর্মকর্তারা খোঁজ করছিলেন যে ‘ভারতবিরোধী কথা বলা কোনো ব্যক্তিকে ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস ভিসা কী করে দিল’—সেই প্রশ্নের উত্তর।
একটি সূত্র বলছে, ‘সে সম্ভবত বাংলাদেশে কোনো এজেন্টকে দিয়ে ভারতের ভিসা জোগাড় করেছিল। আর তার বিরুদ্ধে ভারতে তো কোনো মামলা নেই। সে পর্তুগালের ভিসা নেওয়ার জন্য ভারতে আসতে চেয়েছিল। তাই কীভাবে তার ভিসার আবেদন বাতিল করা যেত?’
অন্য সূত্রটি জানাচ্ছে, ‘যেভাবেই ভিসা জোগাড় করে থাকুক, তার ভিসা রাতেই বাতিল করানো হয়েছে। সেই খবর অবশ্য সে আগে জানতে পারেনি।’
দুটি সূত্রই বলছে, মাহদী হাসান মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যেই বুঝে গিয়েছিলেন যে তার পক্ষে আর এক দিনও ভারতে থাকা সম্ভব নয়। এমনকি পর্তুগালের ভিসার জন্য তাকে কনট প্লেসের ওই বেসরকারি সংস্থার দপ্তরে বুধবার সকালে দ্বিতীয়বার যেতে বলা হলেও সেখানে যে তিনি যেতে পারবেন না, এটি তিনি বুঝে গিয়েছিলেন।
দুটি সূত্রই জানিয়েছে, বিমানবন্দরের কাছের ওই হোটেলে সকালের জলখাবার খেয়ে তিনি সকাল ৮টা ১০ মিনিটে রওনা দেন এবং ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ সিকিউরিটি চেক করতে এগোন।
তারা দুজন জানাচ্ছেন, ইন্ডিগোর দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটের টিকিট ছিল তার কাছে। এটি দিল্লি বিমানবন্দরে একটি সেলফি ভিডিও করার সময় নিজেও জানিয়েছিলেন তিনি। ওই ভিডিওটি তিনি সামাজিক মাধ্যমে আপলোডও করেছেন। সেখানে তিনি হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন।
একটি সূত্র বলছে, মাহদী বিমান সংস্থার চেক-ইন কাউন্টারে গিয়ে নিজের বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে সিকিউরিটি চেকের জন্য এগোন। নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য তিনি নিজের লাগেজ স্ক্যানারের কনভেয়ার বেল্টে দেন। লাগেজ এগিয়ে যায়, তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেই সময়ই এক ভারতীয় কর্মকর্তা তাকে একটু সরে আসতে বলেন। নিরাপত্তা তল্লাশির লাইন থেকে তাকে সরিয়ে এনে শুরু হয় জেরা। বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা তাকে জেরা করেন, খুব শান্তভাবে, কোনো শারীরিক নিগ্রহ ছাড়াই।
তাদের একজন বলছেন, মাহদী হাসান যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, সেটা তো বাংলাদেশের বিষয়—ভারত কেন সেখানে মাথা ঘামাবে?
তবে একটি সূত্র বলছে, ‘আমাদের তিনটি পয়েন্ট ছিল। প্রথমত, সে ভারতকে অপমান করেছে, কটূ কথা বলেছে। দ্বিতীয়ত, সে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে বলে প্রকাশ্যে দাবি করেছে, তাই সে একজন সন্দেহভাজন অপরাধী। তৃতীয় পয়েন্টটিই সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে আমাদের কাছে—সে একজন হিন্দু অফিসারকে মেরেছে বলে দাবি করেছে। এত কিছুর পরেও সে দিল্লিতে আসবে আর এখান থেকে অন্য কোনো দেশে চলে যাবে, আর আমরা চুপ করে বসে থাকব?’
প্রায় আধঘণ্টা তাকে জেরা করা হয় দিল্লির বিমানবন্দরেই। দুটি সূত্রই জানাচ্ছে, তাকে কোনো ধরনের শারীরিক নিগ্রহ করা হয়নি।
দিল্লি থেকে বুধবার বিকেলে ইন্ডিগোর বিমানে বাংলাদেশে ফিরেছেন মাহদী হাসান। বিমানবন্দরেই কয়েকজন সাংবাদিক তাকে ঘিরে ধরে জানতে চান, দিল্লিতে তার সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল।
শুরুতে তিনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চাননি। অপেক্ষমাণ গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতেই তিনি বলেন, ‘বলব আমরা, জানাবো, জানাবো।’
এরপর তিনি বলেন, ‘আমাকে এসএডি লিডার, বৈষম্যবিরোধী নেতা বলে আটক করা হয়েছিল। তারপর আমাকে প্রচণ্ড হয়রানি করা হয়েছে। আমি ফুল লাইফ রিস্কে ছিলাম। এটা আমি বলে না—যে কোনো অন্য দেশের নাগরিককে যে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেটা দেওয়া হয়নি। সুতরাং এইটা আমরা বিস্তারিত জানাবো পরে।’
একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনার ওয়ালেটে নাকি ক্রিপ্টোকারেন্সি পাওয়া গিয়েছিল, সেই বিষয়টি যদি পরিষ্কার করেন।’
জবাবে তিনি বলেন, ‘ওগুলো গুজব।’
বাংলাদেশে ফেরার পর বিমানবন্দরেও এক দফা জেরার মুখে পড়তে হয় বলেও জানান মাহদী। তিনি বলেন, ‘আমাকে আটকানো হয়েছিল, জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বাংলাদেশেও। পরবর্তীকালে আমাকে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়।’