ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার আলোচনায় সংরক্ষিত নারী আসন। সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে ইতিমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন নারী নেত্রীরা।
যদিও দলীয় সূত্রের দাবি, এবার দলের জন্য অবদান, ত্যাগ এবং যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখে নারী আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। এজন্য কাজও চলছে। মনোনয়নের ক্ষেত্রে তরুণ এবং সাবেক ছাত্র নেত্রীরা এবার এগিয়ে রয়েছেন। একইসঙ্গে ত্যাগী, যোগ্য, মেধাবী এবং বিগত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা রাজপথে ছিলেন তাদের সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
আবার এক পরিবার এক প্রার্থী সিদ্ধান্তে অনেক নারী নেত্রীর বাদ পড়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ওদিকে দলের যেসব নারী নেত্রী বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী তাদের অনেককে উচ্চ কক্ষে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপি’র। ফলে বিগত দিনের ত্যাগী ও যোগ্যদের ভেতর থেকেই এবারের সংরক্ষিত আসনে এমপি মনোনয়ন দেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী ২৯৭টি সাধারণ আসনের মধ্যে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২টি, জামায়াত জোট ৭৭টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসন। এই ফলের ভিত্তিতেই সংবিধান ও সংসদীয় বিধান অনুযায়ী ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন দলগুলোর মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টিত হবে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সমীকরণে বিএনপি জোট পেতে পারে ৩৫টি এবং জামায়াত জোট ১২টি, এনসিপি ১টি, স্বতন্ত্র ১টি নারী আসন পাবে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র (বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত) প্রার্থীরা ৭টি আসন পেয়েছেন। ফলে স্বতন্ত্ররাও সম্মিলিতভাবে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন পেতে পারেন। তাদের যদি বিএনপিতে ফিরিয়ে নেয়া হয় তাহলে বিএনপি’র নারী আসন দাঁড়াবে ৩৭টির মতো।
অন্যদিকে সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নেন। বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই আলোচনা শুরু হয়েছে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নিয়ে। আন্দোলন ও সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় থাকা নেত্রী এবং তরুণ প্রজন্মের নেত্রীসহ সাবেক নেত্রীরাও আলোচনায় রয়েছেন। তবে যেসব পরিবারে ইতিমধ্যে এমপি নির্বাচিত ও মন্ত্রী হয়েছেন তাদের সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন না দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে অনেক হেভিওয়েট নারী প্রার্থী বাদ পড়তে পারেন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের বিষয়ে ইসি কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন রোজার মধ্যে করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। ঈদের আগেই এই নির্বাচনের যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করতে চায় ইসি। সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, মার্চের প্রথম সপ্তাহে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে পারে। অধিবেশন শুরু হলে সংসদ সচিবালয় সংরক্ষিত নারী আসনের ভোটার তালিকা প্রস্তুত করে ইসিতে পাঠাবে। এরপর তফসিল ঘোষণা করা হবে।
বিএনপি’র বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, সংসদ নির্বাচনের মতো সংরক্ষিত আসনেও তারা একই নীতি অবলম্বন করবেন। যেসব পরিবার থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, সেসব পরিবার থেকে সংরক্ষিত আসনের কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে না। এক পরিবার এক প্রার্থী এই নীতিতে তারা আরও বেশি নেতৃত্বে বিকাশ ঘটাতে চান বলে এমন নিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সূত্রটি জানায়, দলের এমন সিদ্ধান্তে অনেক হেভিওয়েট নারী প্রার্থী ছিটকে পড়তে পারেন। তবে বিগত দিনের আন্দোলন ও সংগ্রামে তাদের অবদান ও ত্যাগের কারণে শেষ পর্যন্ত দলের হাইকমান্ড কাউকে কাউকে মনোনয়ন দিতেও পারেন বিএনপি’র নারী নেত্রীদের অনেকে মনে করছেন।
সূত্রে জানা গেছে, মনোনয়ন কারা পাবেন তা মাঠপর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা ও অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার ওপরই সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে। বিএনপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এক সদস্য জানান, প্রাথমিকভাবে একটি বড় তালিকা প্রস্তুত করে তা থেকে পর্যায়ক্রমে সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হবে। পরে সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হবে। সেক্ষেত্রে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুমোদন ছাড়া কোনো তালিকা চূড়ান্ত হবে না।
সংরক্ষিত আসনে যাদের নাম বেশি আলোচিত, তারা হলেন- বরিশাল বিভাগীয় বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। তবে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাকে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র হিসেবে মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে তাকে সংরক্ষিত আসনে নাও দেখা যেতে পারে। এর বাইরে বিএনপি’র সাবেক মহাসচিব প্রয়াত খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে ডা. আকতারা খাতুন লুনা (লুনা খোন্দকার), মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, সাবেক এমপি শাম্মী আকতার, নিলুফার চৌধুরী মণি, রাশেদা বেগম হীরা, রেহেনা আকতার রানু, বিলকিস ইসলাম, ফরিদা ইয়াসমিন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসিম উদ্দিন মওদুদ, সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হুসাইন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র সাবেক সদস্য এডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, নাদিয়া পাঠান পাপন, ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি সুলতানা জেসমিন জুঁই, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক প্রয়াত নাসির উদ্দিন পিন্টুর বোন ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য হিসেবে আলোচনায় আছেন।
এর বাইরে সাবেক ছাত্রদল নেত্রী শওকত আরা উর্মি ও শাহিনুর সাগর, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক কাউন্সিলর জেসমিনা খানম, ফটিকছড়ির গুম হওয়া বিএনপি নেতা শহিদুল আলম সিরাজ চেয়ারম্যানের সহধর্মিণী সুলতানা পারভীনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া সংরক্ষিত আসনের বাইরে কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনিন, রিজিয়া পারভিন ও কনকচাঁপাকে উচ্চ কক্ষে দেখা যেতে পারে। তাদের মতো বিগত দিনে যেসব পেশাজীবী নারী আন্দোলন-সংগ্রাম ছাড়াও ফ্যাসিবাদ আন্দোলনে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছিলেন- তাদেরও এবারের মূল্যায়নের তালিকায় রাখা হবে।
সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি প্রত্যাশার কথা স্বীকার করে লুনা খোন্দকার মানবজমিনকে বলেন, অনেক পরিবারে একেকজন একেক দল করে। কিন্তু আমরা সব ভাই-বোন এক দল করি। আমরা সবাই জিয়া পরিবারকে ভালোবাসি। আমরা ভাই-বোন সবাই বাবার যে আদর্শ ছিল, অর্থাৎ বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শকে ধারণ করি।
নারী আসনে এমপি প্রত্যাশার কথা স্বীকার করেন ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি সুলতানা জেসমিন জুঁই। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ২০০৯ সাল থেকে আমি ছাত্রদলের রাজনীতি মাঠপর্যায় থেকে শুরু করি। ম্যাডামের (সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া) সঙ্গে আমি জেলেও গিয়েছিলাম। ওই সময় দুই মাস আমি জেলও খেটেছি। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফোরামে দলের প্রতিনিধি হয়ে কথাও বলেছি।