Image description
 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭৭ আসন পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি জোরদার করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি ইতোমধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। এখন সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করবে। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে জয়লাভকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত আইনগুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধন করেছে। পরিবর্তন আনা হয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশেও। ত্রয়োদশ সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে এসব অধ্যাদেশ বলবৎ হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবারও নির্দলীয় পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। ঐকমত্য কমিশনের সংলাপেও বিএনপি স্পষ্ট জানিয়েছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবশ্যই নির্দলীয় পদ্ধতিতে হতে হবে।

 

জামায়াত ও এনসিপি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে ছিল। কিন্তু বিএনপির বিরোধিতায় সে সময় ভোট হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, দ্রুতই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

 

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংসদ নির্বাচনে আসন বণ্টনের সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, স্থানীয় নির্বাচনেও জোট বহাল থাকবে। জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত এখনও অটুট রয়েছে।

এক বছর আগে থেকে প্রস্তুতি

 

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলো ভেঙে দেয়। গত দেড় বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদগুলো বহাল থাকলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত অধিকাংশ চেয়ারম্যান পলাতক থাকায় সেখানেও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, রমজানের পর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে-এই ধারণা নিয়েই প্রস্তুতি শুরু করেছে জামায়াত জোট। ঢাকার দুই সিটির আওতাধীন ১৫টি সংসদীয় আসনের সাতটিতে জয়ী হয়েছে জামায়াত জোট। একটি আসন কম পেলেও বিএনপি জোটের চেয়ে ঢাকায় বেশি ভোট পেয়েছেন জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা।

স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় পদ্ধতিতে হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালানোর সুযোগ থাকবে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে পরবর্তী কয়েক মাসে ঢাকার দুই সিটির ১২৯টি ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর বাছাই করেছে জামায়াত। এই নেতারা তখন থেকেই ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। সংসদ নির্বাচনের সময়েও নিজেদের প্রচার অব্যাহত রেখেছেন। যেমন ঢাকা উত্তরের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য প্রার্থী জামায়াত নেতা আবদুস সাত্তার সুমন ব্যানার-ফেস্টুনের মাধ্যমে প্রচার শুরু করেছেন। দক্ষিণের ২০, ২১ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও প্রচার শুরু করেছেন।

জামায়াতের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ও দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে স্থানীয় বা জাতীয় যেকোনো নির্বাচনের প্রস্তুতি জামায়াত সারা বছরই নেয়। সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে মেয়র পদে কারা সমর্থন পাবেন, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

জোট থাকবে, তবে মেয়র পদে ছাড় নয়

সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ১৫টি আসনের চারটি এনসিপিকে এবং একটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দেয় জামায়াত। বাকি ১০টিতে লড়ে ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬ আসনে জয় পেয়েছে তারা। পাঁচ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে ঢাকা-৭ ও ঢাকা-১০ আসনে পরাজিত হয়েছেন জামায়াত প্রার্থীরা। ঢাকা-৮ আসনে এনসিপি এবং ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তিন থেকে ছয় হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছে।

জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, রাজধানীর দুই মেয়র পদেই দল সমর্থিত প্রার্থী থাকবে। ঢাকা উত্তরের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন। তিনি সিলেট-৬ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে তাঁকে সংসদীয় রাজনীতিতেই রাখা হবে। তাই উত্তরে নতুন মেয়র প্রার্থী খুঁজতে হবে জামায়াতকে।

ঢাকা দক্ষিণে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে হাজি মো. এনায়েত উল্লাকে। পুরান ঢাকার এই নেতা ঢাকা-৭ আসনে স্বল্প ব্যবধানে হেরেছেন। বিএনপি প্রার্থীর এক লাখ চার হাজার ৬৬৬ ভোটের বিপরীতে তিনি পান ৯৮ হাজার ৪৮৩ ভোট।

জানা গেছে, জামায়াত জোটের শরিক এনসিপি ঢাকায় একটি মেয়র পদ চায়। দলটির ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্যসচিব আমিরুল ইসলাম ইতোমধ্যে নিজেকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। দক্ষিণে শোনা যাচ্ছে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম। তিনি ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের কাছে সোয়া পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন।

তবে জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানিয়েছেন, ঢাকায় মেয়র পদে জোট শরিকদের ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। কাউন্সিলর পদে সমঝোতা হতে পারে।

প্রসঙ্গত, ২০০৩ সালের নির্বাচনে জামায়াত অবিভক্ত ঢাকায় একটি এবং ২০১৫ সালে উত্তরের একটি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে জয় পেয়েছিল। এর বাইরে রাজধানীতে তেমন সাফল্য নেই দলটির। তবে এবার বিএনপির চেয়ে বেশি ভোট পাওয়ায় জয়ের আশা বাড়ছে।

যারা সংসদ নির্বাচন করতে পারেননি, তারা অগ্রাধিকার পাবেন

এবারের সংসদ নির্বাচনে ১২টি সিটি করপোরেশন এলাকার তিনটিতে জামায়াত এগিয়ে ছিল। ছয় সিটিতে বিএনপির কাছে হারলেও শক্ত লড়াই করেছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় বড় ব্যবধানে হেরেছে। বরিশালে তাদের কোনো প্রার্থী ছিল না। জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, জোটের কারণে যেসব নেতা সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, তারা স্থানীয় নির্বাচনে অগ্রাধিকার পাবেন।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়ায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও মহানগর সভাপতি আবদুল জব্বার নির্বাচন করতে পারেননি। তবে নির্বাচনে ব্যাপক সক্রিয় ছিলেন তিনি। এনসিপি এই আসনে জয় পেলেও জামায়াত নেতাদের ভাষ্য, আবদুল জব্বারের তৈরি মাঠের কারণেই সংগঠন ও সাংগঠনিক শক্তি না থাকা এনসিপি জয়ী হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন নিয়ে গঠিত সিটি করপোরেশনে জামায়াত সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হিসেবে আবদুল জব্বারের নাম আলোচনায় আছে।

খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দেওয়া নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মাত্র চার হাজার ভোটে হেরেছেন জামায়াত জোটের প্রার্থী। বিএনপি প্রার্থী আবুল কালামের এক লাখ ১৪ হাজার ৭৯৯ ভোটের বিপরীতে খেলাফত মজলিসের এ বি এম সিরাজুল মামুন পান এক লাখ ১০ হাজার ১৯৬ ভোট।

জামায়াত নেতারা বলছেন, জয়ের সম্ভাবনা থাকার পরও জামায়াত দুটি আসন জোট শরিকদের ছেড়ে দিয়েছে। তাই সিটি নির্বাচনে এসব আসনে জামায়াতেরই প্রার্থী থাকবে। আসন সমঝোতার সময় এভাবেই আলোচনা হয়েছিল।

রংপুর সিটিতে জামায়াতের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী মাহবুবের রহমান বেলাল এবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তাই এখানে নতুন মেয়র প্রার্থী খোঁজা শুরু করেছে জামায়াত। বরিশালে মেয়র প্রার্থী হতে পারেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল। তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি।

খুলনা-২ ও খুলনা-৩ আসন নিয়ে গঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন। খুলনা-২ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে হারিয়ে জয়ী হয়েছে জামায়াত। খুলনা-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থীর ৭৪ হাজার ৮৪৫ ভোটের বিপরীতে ৬৬ হাজার ১০ ভোট পেয়ে জামায়াত প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম মহানগরের চারটি আসনের একটিতেও জিততে পারেনি জামায়াত। এখানে মেয়র পদে দলের সমর্থন পেতে পারেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান।

বিএনপির সঙ্গে জোট থাকলেও ২০১৮ সালে সিলেটে মেয়র পদে প্রার্থী দিয়েছিল জামায়াত। এহছানুল মাহবুব জোবায়ের মাত্র ১০ হাজার ৯৫৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। এবারের সংসদ নির্বাচনে সিলেট সিটি ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসনে জামায়াত ভালো লড়াই করেছে। বিএনপি প্রার্থীর এক লাখ ৭৬ হাজার ৯৩৬ ভোটের বিপরীতে জামায়াত প্রার্থী পান এক লাখ ৩৪ হাজার ৯৮৩ ভোট। সিটি এলাকায় দুই দলের ভোট প্রায় কাছাকাছি। জামায়াতের সিলেট অঞ্চলের পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়া এহছানুল মাহবুব আবারও মেয়র প্রার্থী হতে পারেন। তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি।

ময়মনসিংহ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায়ও বিএনপির সঙ্গে সমান তালে লড়েছে জামায়াত। রাজশাহীতে বিএনপির এক লাখ ২৫ হাজার ৬৪৭ ভোটের বিপরীতে জামায়াত পেয়েছে ৯৭ হাজার ৪৬৬ ভোট। শুধু কুমিল্লায় তারা বড় ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল।

অতীত নজির

২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে ৩৬ উপজেলায় চেয়ারম্যান, ১২৬ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২৬ উপজেলায় নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছিল জামায়াত। এরপর তারা আর নির্বাচনে অংশ নেয়নি। নিবন্ধন হারানোর পরও ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৭৯টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা জয় পান। ২০১৯ সালে তারা চারটি পৌরসভায় জয়লাভ করে।

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, স্থানীয় নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু করতে জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার হতে হবে। সংস্কার হলে জামায়াত অবশ্যই নির্বাচনে অংশ নেবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ভোটের জন্য প্রস্তুত আছি।