বিএনপি’র সাবেক নগর পিতা আরিফুল হক চৌধুরী এখন মন্ত্রী। আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী নির্বাসিত। ফেরারি হয়ে আছেন লন্ডনে। পুরনো এই দু’জন আপাতত ফিরছেন না নগর মসনদে। ফলে এবার যেই আসবেন সিটি মেয়রে তিনি হবেন নতুন মুখ। তিনিই রাঙাবেন সিলেট, তার হাতে উঠবে উন্নয়নের দায়িত্ব। তবে হিসাব অনেক কঠিন। দুই মন্ত্রী সিলেটের। তাদের সঙ্গে বনিবনা হবে এমন মেয়রই চাইবেন সিলেটের মানুষ। তার আগে সরকার দল বিএনপি’র ভেতরে টিকিট বা সমর্থন নিয়ে যে মুল্লযুদ্ধ হবে সেটি এখন থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেকেই মাঠে রিহার্সেলও দিয়ে ফেলেছেন।
বিএনপি’র ভেতরেই এবার একাধিক নতুন মুখের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন নগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের আরিফ জমানার প্যানেল মেয়র-১। অভিজ্ঞতায় তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। নগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হওয়ায় দলীয়ভাবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে রয়েছে গভীর সম্পর্ক। সংসদ নির্বাচনে তিনি ছিলেন সিলেট-১ আসনের নির্বাচনী সমন্বয়ক। ফলে সিটিতে ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচন ম্যাকানিজমের সকল দায়িত্ব ছিল তারই হাতে।
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী এক ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে। দলগতভাবে নগর বিএনপিতে রয়েছে শক্ত অবস্থান। তিনিও নগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও এক সময় সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। নেতাকর্মীরাই জানিয়েছেন- নগরে বিএনপি’র এখন যে শক্তিশালী অবস্থান সেটির ক্ষেত্র তৈরি হয় মিফতাহ সিদ্দিকীর হাত ধরেই। দলের চরম দুর্দিনে মিফতাহ সিদ্দিকী নগর বিএনপিকে ঢেলে সাজিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতা ফিরিয়ে এনেছেন। ফলে তৃণমূলের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। মিফতাহ সিদ্দিকী সংসদ নির্বাচনে সবাইকে বলে-কয়ে সিলেট-৪ আসনে নেমেছিলেন। পরে যখন আরিফুল হক চৌধুরী প্রার্থী হন তখন তিনি পিছুই হটেন ও নীরব হয়ে যান। তবে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ার কারণে বিভাগের চার জেলায়ই তিনি প্রচারণায় অংশ নেন। সিলেট নগরে তিনি বেশির ভাগ সময় প্রচারণায় সময় দিয়েছেন। মেয়র পদে আলোচনায় মিফতাহ সিদ্দিকীর নাম রয়েছে নেতাকর্মীদের মুখে মুখে। আন্দোলন সংগ্রামের সময় তিনি নেতাকর্মীদের কাছাকাছি ছিলেন। সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনে বিএনপি’র দলীয় ফোরামে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিলেন নগর বিএনপি’র বর্তমান সভাপতি নাসিম হোসাইন। মেয়র পদে বিএনপি’র সমর্থন ও পরবর্তীতে মনোনয়ন পাবেন বলেও পাননি। বিএনপি’র আন্দোলনকালীন সময়ে অসুস্থতায় কাবু ছিলেন নাসিম হোসাইন। অভ্যুত্থানের পর থেকে সরব। তবে বিএনপি’র কর্তৃত্ব তার হাতে নেই। প্রবীণ নেতা হওয়ায় মাঠের আলোচনায় রয়েছে তার নাম। বদরুজ্জামান সেলিম হচ্ছেন সিলেট নগর বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বারবারই তিনি নগরের টিকিট চাইছেন। শেষবার তিনি আরিফুল হক চৌধুরীকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ান। চলে যান লন্ডনে। দলের সাধারণ সম্পাদক হয়েও দুর্দিনে তেমন কাজ করতে পারেননি। তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন। সিলেট-৪ আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন চেয়েছিলেন। হেঁটেছেন নির্বাচনী এলাকায়ও।
আরিফ নামার পর তিনিও পিছু হটেন। এবারের সিটি নির্বাচনেও তার নাম বেশ জোরেশোরেই ভাসছে। শেষ মুহূর্তে কী করেন বদরুজ্জামান সেলিম সেটি দেখতে অপেক্ষায় থাকতে হবে। নগর বিএনপি’র বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী অনেক আগে থেকেই হাঁটছেন মাঠে। নির্বাচনের প্রস্তুতি আছে তার। নগরের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার কারণে বিএনপিতে রয়েছে প্রভাব। নানা সময় বন্যা, করোনা, জলাবদ্ধতাসহ দুর্যোগে মানুষের কাছাকাছি রয়েছেন তিনি। এবার চমক নিয়ে মাঠে নামতে পারেন সাবেক কাউন্সিলর ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি ফরহাদ হোসেন শামীম। দীর্ঘদিন দলের বাইরে ছিলেন। এবার দলে ফিরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হয়েছেন। এদিকে বিএনপি’র একাধিক নেতার নাম মাঠে থাকলেও জামায়াতে ইসলামী থেকে একক নেতার নামই শোনা যাচ্ছে। তিনি হচ্ছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। কয়েক বছর আগে তিনি নগর পিতার পদে লড়াইও করেছেন। এখন তিনি সিলেটের রাজনীতি ছেড়ে কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন। সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফের ব্যাক করতে পারেন সিলেটে- এমন গুঞ্জন রয়েছে জামায়াত নেতাদের মুখে মুখে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী হারলেও ভোটে বিপ্লবই দেখিয়েছেন।
অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে জামায়াত প্রার্থী বিপুল ভোট পেয়েছেন। ফলে সিটি নির্বাচনে জামায়াতের ভোট ব্যাংক হেরফের হওয়ার সুযোগ কম বলে জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা। বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন থেকে নির্বাচনী প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজ মাওলানা মাহমুদুল হাসান প্রার্থী হতে পারেন। তিনি আগেও একবার মেয়র পদে নির্বাচন করেছেন। গুঞ্জন রয়েছে; আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে প্রার্থী না দিলেও সুশীল সমাজ থেকে কাউকে প্রার্থী করে নির্বাচনে বাজি ধরতে পারে।