বাংলাদেশে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদে প্রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ক্ষমতা নিয়ে বিএনপি সরকার শুরুতে ইচ্ছামতো আইন পাস করতে পারবে। কিন্তু অর্থনীতিতে হোঁচট খেলে সরকার একদিকে উত্থানশীল জামায়াত এবং অন্যদিকে সুপ্ত আওয়ামী লীগ ঘাঁটির চাপে পড়বে। চাকরি ও দুর্নীতি নিয়ে তরুণদের অসন্তোষ সহজে মিলিয়ে যাবে না। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়া তারেক রহমানকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তবে তার রাজনৈতিক সাফল্যের মূল নির্ভরতা থাকবে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার ওপর। বিখ্যাত মার্কিন ম্যাগাজিন টাইমে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং লন্ডনের রয়েল সোসাইটি অব আর্টস-এর ফেলো ফরিদ এরকিজিয়া বাখ্?তের লেখা এক নিবন্ধে এ সব কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার দুইদিন পর এখানে পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত এসেছে ১৪ই ফেব্রুয়ারি। তবে এই বিজয়ের পাশে একটি তারকা চিহ্ন রয়ে গেছে। তা হলো ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে স্বৈরশাসক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম এই নির্বাচনে তার আওয়ামী লীগ দলকে ভোটে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফলে এখানে ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থানও দেখা গেছে। এই দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র শাসনে শাসিত রাজনৈতিক পরিসরে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। কখনও ক্ষমতায় না থাকা এবং তুলনামূলকভাবে দুর্নীতিমুক্ত হিসেবে পরিচিত এই দলটি ভারতের সীমান্তবর্তী পশ্চিমাঞ্চলের দরিদ্র এলাকায় বেশি সমর্থন পেয়েছে। শিল্প ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ কম হয়েছে ওইসব এলাকায়।
বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে তারা ওই সময়ের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বছরে প্রায় ৯ ভাগ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। যা বর্তমানে কমে প্রায় ৪ ভাগে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবৃদ্ধির দেশের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ। দলটি শিক্ষা খাতে জিডিপি’র ২ ভাগ থেকে ৬ ভাগ এবং স্বাস্থ্য খাতে ০.৭৫ ভাগ থেকে ৫ ভাগ ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার জন্য অর্থায়নে প্রয়োজনীয় রাজস্ব বাড়ানোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা নেই। প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণের বেশি করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপি’র ২৩ ভাগ থেকে ৩৫ ভাগে উন্নীত করতে হবে। গত দেড় বছরে উচ্চ সুদের হার নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, কেবল মুদ্রানীতি নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত জটিলতাই খাদ্যের উচ্চমূল্যের প্রধান কারণ। এটিই তারেক রহমান সরকারের জন্য একটি দুর্বল জায়গা। কৃষি অর্থনীতির শতকরা ১২ ভাগ এবং কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৪ ভাগ। অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি কর্মক্ষম মানুষের জীবিকার উৎস। শহরে খাদ্যমূল্য কমানো ও কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হলে খামার থেকে শহর পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাবশালী, নিয়ন্ত্রণহীন মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। পাশাপাশি ফসল-পরবর্তী সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ জরুরি।
আরেকটি বড় অগ্রাধিকার হলো- প্রবাসী আয়। প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী, বিশেষত উপসাগরীয় দেশে কাজ করছেন। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আইএমএফ’র কর্মসূচির চেয়ে এই জীবনরেখার গুরুত্ব কম নয়। প্রায় এককোটি বাংলাদেশি শ্রমিক বিদেশে কাজ করছেন। তার বেশির ভাগই পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে। বৈদেশিক রিজার্ভের ক্ষেত্রে তারা আইএমএফ’র চেয়ে অনেক বেশি করেছেন। গত তিন মাসে তাদের পাঠানো প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আইএমএফ’র পুরো সহায়তার সমান। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক প্রবাসী হুন্ডি থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে শুরু করেন। এটাই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল। এ কারণে নাটকীয় ফল পাওয়া যায়। ২০২৩ সালের ২১ বিলিয়ন রেমিট্যান্স লাফিয়ে ২০২৫ সালে চলে যায় ৩০ বিলিয়নে। এর আগে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো তাদের রেমিট্যান্স শাসকগোষ্ঠীর কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বলতে গেলে, এই অতিরিক্ত ৯ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বার্ষিক তৈরি পোশাকের আয়ের চেয়েও বেশি। ফলে রেমিট্যান্স ২০২৩ সালের ২১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল নিয়ন্ত্রণে শিথিলতা এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুতই এ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ হারাতে পারে। যদি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলকে নিয়ন্ত্রণে শিথিল হয়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবাহ অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে।
প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কাজের জন্য যান। যা অর্থনীতির জন্য এক ধরনের ‘সেফটি ভালভ’। বছরে ২০ লাখ নতুন কর্মপ্রার্থী তৈরি হলেও দেশ সবাইকে কাজ দিতে পারে না। এটা ছাড়া, দেশের বহুল প্রশংসিত জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ পরিণত হবে ‘পাউডার কেজে’। তবে শ্রম রপ্তানি খাতে দুর্নীতি ও শোষণ প্রবল। কয়েকটি গন্তব্য দেশ ইতিমধ্যে বাংলাদেশিদের জন্য দরজা বন্ধ করেছে। ফলে নতুন সুযোগের জন্য দেশটি সৌদি আরবের ওপর ভয়াবহভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্কার বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদ পরামর্শ দেন- বৃহৎ পরিকল্পনা মাথায় রেখে ‘ছোট কিন্তু উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন প্রকল্প’ দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত। শিল্পে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দুর্বল আর্থিক খাত সংস্কার করাও জরুরি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণ, যার ফলে রপ্তানিতে শুল্ক-সুবিধা কমে যাবে। এতে আরও বলা হয়, অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও জড়িত। বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আসিয়ানে যোগদানের কথা বলেছে। আবার আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনে তারেক রহমান দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর কথা উল্লেখ করেছেন, যা কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য। বাংলাদেশে থাকা দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আসিয়ানে যোগ দিলে বাংলাদেশ বহুমুখী সরবরাহ শৃঙ্খল ও বৈদেশিক বিনিয়োগের সুযোগ পেতে পারে।
ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত থাকা সত্ত্বেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে। হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেয়ায় ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে উত্তেজনা বেড়েছে। তবে অবকাঠামো বিনিয়োগে চীনের সঙ্গে ভারতের প্রতিযোগিতা কঠিন। চীন ইতিমধ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ড্রোন কারখানা স্থাপনে চুক্তি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বৃহত্তম বাজার এবং জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগকারী। নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঝুঁকি সম্পর্কে তারা নতুন সরকারকে সতর্ক করবেন। তবে মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো স্পষ্ট ব্যবসাবান্ধব বার্তার অপেক্ষায় আছে। বাংলাদেশি অভিজাতদের রাজনৈতিক প্রবণতা পশ্চিমমুখী হলেও অবকাঠামো বিনিয়োগ এসেছে মূলত এশিয়া থেকে- বিশেষত জাপান ও চীন থেকে। তারেক রহমান ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিতে পারেন। বলতে পারেন, মার্কিন ব্যবসাকে দ্রুত এগোতে হবে; নচেৎ তাকে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকতে হতে পারে। চ্যালেঞ্জ বড়, তবে তারেক রহমানের হাতে সুযোগ আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার।