রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধির অভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির হ-য-ব-র-ল অবস্থা। মশা নিয়ন্ত্রণে অনেকটা ঘুমিয়ে দুই সিটি। কোথাও কোথাও দায়সারা কাজ চলছে এতে কাজ হচ্ছে না। স্থানীয়রা বলছেন, জনপ্রতিনিধি না থাকায় সিটি করপোরেশনের কর্মীরা কাজ করছেন না। বিশেষ করে মশক নিধন কর্মীদের দেখাই যায় না। এ কারণে হঠাৎ মশার উৎপাত বেড়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় জনজীবন রীতিমতো অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। জানুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
সমপ্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, মশার ৯০ শতাংশই কিউলেক্স। মার্চে মশার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা। মশার এই উপদ্রবে শুধু ঘুমের ব্যাঘাতই হচ্ছে না; ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। গতবছরে মশার কামড়ে ৪১২ জনের প্রাণগেছে। অধিকাংশ মৃত্যুই দু’সিটিতে।
রাজধানীর মগবাজার এলাকার বাসিন্দা আবিদা পারভিন বলেন, মশার অত্যাচারে বারান্দায় দাঁড়ানোই যায় না। বিকেল হলেই মশার আক্রমণ শুরু হয়। রাতের বেলা মশারী টানালেও বুঝা যায় মশারীর উপরে এবং চারদিকে মশার ভনভন করতে থাকে। আবিদা বলেন, ঢাকায় মশার সমস্যা নতুন নয়। মশার কামড়ে সংঘটিত অসুস্থতাগুলো লেগেই আছে। তবুও কেন জানি আমাদের দুই সিটি করপোরেশন এটা নিয়ন্ত্রণ করতে মোটামুটি ব্যর্থই। রাজারবাগ এলাকার আল-আমিন বলেন, শুধু এ কয়েকদিনেই নয়, কয়েকমাস থেকেই দেখছি মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে।সিটি কর্পোরেশন থেকে এসব নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নাই, তেমন কাউকে দেখিনা এখন। নতুন সরকার এসেছে এখন। তারা দারিত্ব নিয়ে যদি এবার কিছু করে আরকি। আরেক বাসিন্দা রহমান বলেন, মশা মারার যন্ত্র শেষ কবে দেখেছি মনে নেই। তবে মশার যন্ত্রণা অসহনীয় পর্যায়ে চলে এসেছে। শনির আখড়া এলাকার বাসিন্দা রনি বলেন, শনির আখড়ার খালটি দীর্ঘদিন ধরেই পরিস্কার করা হয় না। নোংরা পানি জমে আছে। স্বভাবতই এই এলাকায় অনেক বেশি মশার বেড়ে যাচ্ছে।
গবেষকেরা বলছেন, তিন কারণে এবার মশার প্রকোপ বেড়েছে। প্রথমত, এবার শীতের মাত্রা কম আর স্বাভাবিকের চেয়ে একটু আগেই শীত বিদায় নিয়েছে। আবার এ বছর মশার প্রকোপ আগেই শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, নর্দমা ও জলাশয়ের দূষণ যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। তৃতীয়ত, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধির অভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এগোচ্ছে না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যাবিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে সম্প্রতি পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আর মশার ৯০ শতাংশই কিউলেক্স। মার্চে মশার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মশার বিস্তার দেখা যায় কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। এর মধ্যে কিউলেক্সের বিস্তারই বেশি। কিউলেক্সের কামড়ে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ ও জাপানি এনসেফালাইটিস হয়। তবে এ দুটি রোগ দেশে ততটা প্রকট নয়। এডিসের কামড়ে ডেঙ্গু ও অ্যানোফিলিসের কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়।
আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, জাপানি এনসেফালাইটিসে মৃত্যুর অনুমিত হার ২৫ শতাংশ। এ রোগে রাজশাহী, রংপুর ও পার্বত্য অঞ্চলে অতীতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে দেশে এ রোগ বেশি দেখা যায় না। কারণ, এখানে শূকরের পালন খুব বেশি মাত্রায় নেই।
লার্ভা পরীক্ষা করতে বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি তুলে তাতে লার্ভার সংখ্যা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সংগৃহীত পানিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ১ হাজার ২৫০-এ।
প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি যাচাইয়ের পদ্ধতিটিও চমকে দেয়ার মতো। একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে, তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৮৫০। অধ্যাপক বাশারের আশঙ্কা, মার্চে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেই বিশ্বমানে তা বেশি। সেখানে ঢাকায় ৮৫০টি, এটি কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি বিপৎসংকেত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) পাঁচ এলাকায় মশা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এখানে মশা বেড়ে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টানা মশার ফাঁদ রেখে এ গবেষণা করা হয়। গত ১৬ থেকে ২০শে জানুয়ারি রাজধানীর পাঁচটি এলাকায় ১৭ হাজার ১৫৯টি মশা পাওয়া যায়। আর ৩০ জানুয়ারি থেকে ৩রা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া যায় ২২ হাজার ৩৬২টি। ওই পাঁচ এলাকা হলো উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের পার্ক, মিরপুর-২এ ডিএনসিসির ভান্ডার শাখা অফিস, গুলশান ১-এর পুরাতন ভান্ডার শাখা অফিস, মিরপুর- ১ এর ১০ নম্বর ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টার ও মোহাম্মদপুরের ডিএনসিসির আঞ্চলিক অফিস।
ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় কবিরুল বাশার ও তার দলের করা গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর সর্বত্র সমানভাবে মশা নেই। কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া, শ্যামপুর, রায়েরবাজার, উত্তরা ও রাজধানী-সংলগ্ন সাভার এলাকায় লার্ভা ও প্রাপ্তবয়স্ক মশার ঘনত্ব বেশি। অন্যদিকে শাহবাগ ও পরীবাগের মতো মধ্য রাজধানী এলাকায় তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া ও দূষণ দুটোই কিউলেক্স বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জি এম সাইফুর রহমান বলেন, অতীতে মার্চের মাঝামাঝি থেকে কিউলেক্সের উপদ্রব বাড়লেও এ বছর তা ফেব্রুয়ারি থেকেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী কালবৈশাখের আগমন পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি ও গড় তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিই কিউলেক্সের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। তাপমাত্রার পাশাপাশি দূষণও বড় কারণ। আবর্জনা, বদ্ধ জলাশয় ও নর্দমা কিউলেক্সের প্রধান প্রজননক্ষেত্র।
সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধি না থাকায় মশা নিধনের ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো হচ্ছে না বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। অনেক জলাশয়ে মাছের চাষ হয়। সেখানে সিটি করপোরেশনকে কাজ করতে দেয়া হয় না। এমন সমস্যাও রয়েছে।