Image description

ড. মুহাম্মাদ সাইদুল ইসলাম 
======================

অভিযোগ মারাত্মক! আগেই শুনেছি এসব, কিন্তু "কন্সপিরেসি থেয়োরি" বলে উড়িয়ে দিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে, এক নিশ্চিত সাজানো একতরফা নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জুলাইয়ের স্বপ্ন ভূলুণ্ঠিত।  কয়েকটি নমুনা দিই:

১.
শুরুতেই নির্বাচন কমিশনের ন্যাক্কারজনক পক্ষপাতিত্ব সুস্পষ্ট। জামায়াত প্রার্থীদের দাঁড়ি, কমা ভুল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পরখ করে বৈধতার ঘোষণা দিলেও বৈষম্যবিরোধী মামলার ফেরারি ও জেলখাটা আসামীদের বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এবং ফ্যাসিবাদের দোসর জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের নির্দ্বিধায় বৈধতা দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। অনেক আওয়ামী ফ্যাসিস্ট জাতীয় পার্টি এবং বিএনপিতে ঢুকে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে নির্বাচনে। পেয়েও গেছে বৈধতা। 

কক্সবাজার-২ এর প্রার্থী জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদূর রহমান আজাদের মনোনয়ন বাতিলের পর সালাউদ্দীনের নিয়োগকৃত সরকারী কর্মকর্তারা হাততালি মারে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে জানলাম, জামায়াতের প্রায় অর্ধডজন ক্যান্ডিডেটের মনোনয়ন পত্র বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। একই ধরনের অভিযোগ বিএনপি প্রার্থীদের থাকলেও তাদের মনোনয়ন বৈধ! সারাদেশে জামায়াত ও বিএনপির বিদ্রোহী কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। এখন পর্যন্ত বিএনপির কোন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের খবর পাওয়া যায়নি।

মনোনয়ন বাতিল বা স্থগিত খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। জামায়াতের যে সকল প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, নিশ্চয়ই যৌক্তিক কোন কারণ আছে। আপিলে তা নিষ্পত্তি হবে বলেই মনে করি। কিন্তু প্রশ্নটা হলো, সারাদেশে বিএনপির একজন প্রার্থীরও মনোনয়ন বাতিল হয়নি কেন? এইটা অস্বাভাবিক এবং নজিরবিহীন ঘটনা। বিএনপির কোন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা যাবে না, এ রকম সিদ্ধান্ত হয়তো সরকার বা নির্বাচন কমিশনের নাই; কিন্তু স্থানীয় রিটার্নিং কর্মকর্তার এই সাহস নাই যৌক্তিক কারণ থাকা সত্ত্বেও বিএনপির কোন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল বা স্থগিত ঘোষণা করার! এই সাহস নাই মানে পুরো ৬৪ জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তার নাই। এসব রিটার্নিং কর্মকর্তা কী নির্বাচন উপহার দিবেন তা খুব সহজে অনুমেয়!

২.
জনাব তারেক রহমানকে লন্ডন থেকে ফিরিয়ে আনা, সীমাহীন সরকারি প্রোটোকল দেয়া, এক দিনের মধ্যেই তার ন্যাশনাল আইডি প্রস্তুত করা, প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারসহ মেইনস্ট্রিম সকল মিডিয়াতে তারেক রহমান এবং বিএনপিকে নিয়ে হাইপ তোলা এবং একক সমর্থন দেয়া, মোদির পাঠানো চিঠিতে তারেক রহমানকেই বাংলাদেশের ভবিষ্যত নেতৃত্বের ব্যাপারে পরিস্কার গ্রীণ সিগনাল দেয়া, এসবই প্রমাণ করে একটা মেটিকুলাস ডিজাইনের দিকেই এগুচ্ছে বাংলাদেশ। 

গত ৩রা জানুয়ারি, বিএনপির অফিসে, জনাব তারেক রহমান এবং এনএসআই এর প্রধানের মধ্যে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছে। এখানে একটা "স্ক্রিপ্টেড ম্যাচ এর প্রস্তুতি" আরো দিবালোকের মতো স্পষ্ট হচ্ছে। 

আমেরিকায় ইলেকশনের ২ মাস ১৬ দিন পরে নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নেয়। সেই ট্রাঞ্জিশনের টাইমে "প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট" এবং সিটিং প্রেসিডেন্ট দুইজনই ইন্টেলিজেন্স ব্রিফ পায়। 

তারেক রহমানকে কি "প্রাইম মিনিস্টার ইলেক্ট" ধরে নিয়ে এনএসআই চীফ ইন্টেলিজেন্স ব্রিফ দিতে গিয়েছিলেন? কোনও রাখঢাক না করেই সরাসরি অফিসে গিয়ে দেখা করেছেন, যেইটা বাংলাদেশ এমনকি পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন! নির্বাচনে  কিভাবে বিএনপিকে সুবিধা করে দেয়া যায়, তার মেটিকুলাস ডিজাইন নিয়েই আলোচনা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।  এই এনএসআই-ই ছিলো হাসিনা আমলে র-এর আখড়া। নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে একটি দলের প্রধানের সঙ্গে প্রথমে ডিএমপি প্রধান, পুলিশের আইজিপি, এরপর আবার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) প্রধানের রুদ্ধদ্বার বৈঠক সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অবশ্যই অন্তরায়। 

৩.
বেশ কিছু গবেষণা এবং তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে বেরিয়ে এলো: ২০০৮ সালে মতোই দেশে আরেকটা একতরফা নির্বাচন আয়োজনে দেশি-বিদেশি চক্র পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।  সাম্প্রতিক ওসমান হাদীর হত্যাকান্ড এবং প্রথম আলো- ডেইলি স্টারে হামলার পর ঐ চক্র তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ১/১১ সরকার একতরফা সাজানো নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলকে ২৭০ আসনে এবং বিএনপি জামায়াতকে ৩০ আসনে নির্বাচিত ঘোষণা করে। একই কায়দায় এবার আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটকে ২০০ এর অধিক আসনে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটকে ৩০-৪০ আসনে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। সাজানো নির্বাচনে জনগণের ভোটের সঠিক প্রতিফলন হতে দেয়া হবেনা।

ভারতসহ আওয়ামী লীগ, পশ্চিমা দেশগুলো, সেনাবাহিনী এবং এদেশে ১/১১ এর কুশিলব সুশীলদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছুটা বাঁধা হিসেবে দাঁড়িয়েছেন প্রফেসর ইউনুস, যিনি এখনো চাচ্ছেন তার সারা জীবনের অর্জিত সম্মান যেন নষ্ট না হয়। কিন্তু মনে হচ্ছে, তার এখন কিছুই করার নাই! 

বিচার বিভাগ, আইন আদালত, প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সবগুলোই প্রায় শতভাগ বিএনপির চাওয়া মত তাদের লোকদের দিয়ে সাজানো হয়েছে। সর্বশেষ গুমের বিচার প্রশ্নে তাদের অফিসারদের ইনডেমনিটি দেয়ার শর্তে বিএনপি রাজি হয়ে যাওয়ায়, সেনাবাহিনীও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করবে বলে সূত্রে প্রকাশ। 

হাদি হত্যাকান্ডের পর বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দৃষ্টি গোচর হয়েছে। দেখা যাবে, জামায়াত জোটের অনেক প্রার্থী ব্যাপক ভোট পেয়েও সামান্য কয়েক ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দেয়া হবে। অনেকটা গরু মেরে জুতা দানের মতো, পরাজিত প্রার্থীকে "অনেক ভোট প্রাপ্তি" দেখিয়ে মিথ্যা সান্ত্বনা দেয়া হবে। 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই প্রথম বারের মতো এক অশুভ ত্রিমূর্তির (unholy trinity) ঐক্য দৃষ্টিগোচর হচ্ছে: আওয়ামী ফ্যাসিবাদ, বিএনপির চাঁদাবাজি অংশ, এবং জাতীয় পার্টির স্বৈরাচারী অংশ। তাদের সহযোগিতায় আছেন ডিপ স্টেটের কিছু অংশ, ইন্ডিয়ার র, এবং বাইরের দেশের কিছু ডিপলোম্যাট। এক মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে এরা এখন সওয়ার হয়েছে জনাব তারেক রহমানের ঘাড়ে। 

জনাব তারেক রহমানই হয়তো আগামীর প্রধানমন্ত্রী। আর এই টাইটেলেই তাকে ডাকা শুরু হয়ে গেছে। তার সামনে এখন দুটো বিকল্প: (ক) এই অশুভ ত্রিমূর্তি এবং তাদের দেশী এবং বিদেশি সহযোগীদের মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা, অথবা (২) জুলাইয়ের স্বপ্নের আলোকে এক অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা। প্রথম বিকল্পে বাংলাদেশে নিশ্চিত ভাবেই ভারতের অধীনস্থ "চোরতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ ২.০" এর জন্ম অনিবার্য, এবং সে ক্ষেত্রে "জুলাই বিপ্লব ২.০"ও অনিবার্য হয়ে উঠবে। সূদুরপ্রসারী ফলাফল কি হবে সেটা বলা মুশকিল, তবে এই অশুভ ত্রিমূর্তি সফল হলে সোমালিয়ার মতো বাংলাদেশও এক চিরস্থায়ী ব্যর্থ রাস্ট্র ব্যবস্হার দিকেই এগিয়ে যাবে। মুখ থুবড়ে পড়বে  নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। তবে, দ্বিতীয় বিকল্পে বাংলাদেশের জন্য রয়েছে এক সুন্দর গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ যা নির্মিত হবে ইনসাফ এবং সামাজিক সুবিচারের উপর। জনাব তারেক রহমানকেই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তিনি কি এই অশুভ ত্রিমূর্তিকে তার নিজের ঘাড়ে সওয়ার হতে দিবেন, নাকি জুলাইয়ের স্বপ্ন বুকে নিয়ে এক ইনক্লুসিভ নতুন বাংলাদেশ গড়বেন।  

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নানইয়াং টেকনোলোজিকাল ইউনিভার্সিটি সিংগাপুর