Image description
নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানিয়েছেন, পরীক্ষাগারে কিটক্যাটের বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষার পর, তার ভিত্তিতে মামলা করেছেন তিনি। পৃথক জায়গা থেকে কিটক্যাটের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। দুবারই কিটক্যাট মানহীন প্রমাণ হয়েছে।

বাংলাদেশেও বিতর্কে জড়াল সুইজারল্যান্ডের বহুজাতিক খাদ্য ও পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নেসলে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয় কিটক্যাটকে (চকলেট কোটেড ওয়েফার) ‘মানহীন’ দাবি করে মামলা হয়েছে। এরপর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে।

গত ২৪ নভেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বাংলাদেশের বাজারে থাকা কিটক্যাট ‘মানহীন’ উল্লেখ করে ‘নেসলে বাংলাদেশ’– এর বিরুদ্ধে মামলা করেন।

পরে ঢাকার নিরাপদ খাদ্য আদালত গত ১৫ ডিসেম্বর এক আদে‌শে ২০২৬ সা‌লের ২১ জানুয়া‌রির মধ্যে কিটক্যাটের একটি লট বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নেসলে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিপাল আবে বিক্রমা ও পাবলিক পলিসি ম্যানেজার রিয়াসাদ জামানকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা দেন। হাইকোর্ট থেকে দুজনই জামিন নিয়েছেন।

নেসলে বাংলাদেশ জানিয়েছে, আদালত বাজার থেকে তাদের কোনো লট প্রত্যাহার করতে বলেননি। একটি ব্যাচের পণ্য বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেন। কিটক্যাট মানহীন নয় দাবি করে নেসলে বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস ম্যানেজার (করপোরেট) তানজিনা তারিক স্ট্রিমকে বলেছেন, মামলায় বিএসটিআইয়ের মানদণ্ড মেনে কিটক্যাট বিক্রি হয় না অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু কিটক্যাট বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিতে হবে– এমন পণ্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। কোনো মানদণ্ডও তো তারা কখনো দেয়নি।

তিনি বলেন, বিএসটিআইর বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং না থাকায় কিটক্যাটের প্রতিটি চালান বাজারজাতের আগে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) গুণমান পরীক্ষা করে। পরে আমদানি করা দেশের ল্যাব প্রতিবেদনের সঙ্গে কাস্টমসে বিসিএসআইআরের রিপোর্টও জমা দিতে হয়। ফলে কিটক্যাটকে মানহীন বলার সুযোগ নেই।

নেসলের দাবি নাকচ করে বাদী নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মোহাম্মদ কামরুল হাসান স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, পরীক্ষাগারে কিটক্যাটের বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষার পর, তার ভিত্তিতে মামলা করেছেন তিনি। পৃথক জায়গা থেকে কিটক্যাটের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। দুবারই কিটক্যাট মানহীন প্রমাণ হয়েছে।

কিটক্যাটের নমুনা পরীক্ষা করা হয় ডিএসসিসির খাদ্য পরীক্ষাগার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। পরীক্ষার ফলাফলে দাবি করা হয়, বিডিএস (১০০১:২০১০) ওয়েফার বিস্কুট মান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১ শতাংশ অম্লতা বা অ্যাসিডিটি থাকার কথা। কিটক্যাটের ওয়েফার বিস্কুটে তা ২ দশমিক ৩২ শতাংশ মিলেছে। বিডিএস সিএসি (৮৭:২০২৪) চকলেট মান অনুযায়ী, কিটক্যাটের ওয়েফারে আবরণ হিসেবে যে চকলেট থাকে, তাতে দুধের কঠিন পদার্থ ১২ থেকে ১৪ শতাংশ থাকার কথা। অথচ পাওয়া গেছে ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। দুধে ফ্যাট বা চর্বি ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশের জায়গায় রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ২৩ শতাংশ।

পরীক্ষার ফলাফল উল্লেখ করে কামরুল হাসান এজাহারে কিটক্যাট চকলেটকে মানহীন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উল্লেখ করেছেন। পণ্যটি বাজারজাতে কোনো ধরনের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেছেন তিনি।

কামরুল হাসানের ভাষ্যে, কিটক্যাটের কোনো অনুমোদন নাই। সাধারণত খাদ্যপণ্য বাজারজাত করার আগে বিএসটিআইয়ের অনুমতি নিতে হয়। আবেদন করলে খাদ্যপণ্যের পরীক্ষা করে স্টিকার লাগিয়ে দেয় বিএসটিআই। কিটক্যাটের ক্ষেত্রে এটি শুরু থেকেই নাই।

বিএসটিআইয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লুৎফুন্নেসা খানম স্ট্রিমকে জানান, তাদের মানদণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ৩০০টি পণ্য আমদানিতে অনুমোদন নিতে হয়। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে অনুমতির প্রয়োজন নেই। নেসলে বাংলাদেশের কিটক্যাট ৩০০টি পণ্যের মধ্যে নেই।

বিসিএসআইআর ও বিএসটিআই যা বলছে

যেকোনো পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করে বিসিএসআইআর। তবে বিসিএসআইআর এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, যেখান থেকে পরীক্ষা করে মান উত্তীর্ণ হলে সেটি বাংলাদেশের বাজারে বিক্রির অনুমতি মিলবে। বিসিএসআইআর চট্টগ্রাম গবেষণাগারের প্রিন্সিপাল সাইন্টিফিক অফিসার ড. শ্রীবাস চন্দ্র ভট্টাচার্য্য স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা শুধু পণ্যের মান পরীক্ষা করি। সেটি বাজারজাতের অনুমতি দেয় বিএসটিআই।’ কিটক্যাটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। আমরা কিটক্যাটের গুণগত মান সব সময় সঠিক পেয়েছি।’

কিটক্যাটের মতো পণ্যের মান বিচারে সরকারি কোনো মানদণ্ড নেই বলে জানিয়েছে বিএসটিআই। তবে একটি খসড়া মানদণ্ড তৈরি করা হয়েছে, যা খুব দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। বিএসটিআইয়ের মান উইংয়ের উপপরিচালক (কৃষি ও খাদ্য) এনামুল হক স্ট্রিমকে বলেন, খাদ্য পণ্যে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন (ডাইভার্সিফিকেশন) আসে। আগে থেকে মানদণ্ড তৈরি করা থাকে না; আবার পুরাতন মানদণ্ড দিয়েও এসব পণ্য বিচার করা যায় না। আমাদের ওয়েফার বিস্কুটের মানদণ্ড আছে। তবে চকলেট কোটেড ওয়েফারের মানদণ্ড নেই।

তিনি বলেন, সম্প্রতি ওয়েফার বিস্কুটের কোটেড ফর্মকে স্ট্যান্ডার্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গেজেট করার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হবে। গেজেট হলে বাজারজাতের জন্য কিটক্যাটকে বিএসটিআইয়ের অনুমতি নিতে হবে। এর আগে পর্যন্ত তাদের অনুমতি নেওয়ার দরকার নেই। নেসলে বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে এনওসি (অনাপত্তিপত্র) দিয়েছে বিএসটিআই।

কিটক্যাট নিয়ে ডিএসসিসির পরীক্ষার বিষয়ে এনামুল হক বলেন, ‘পরীক্ষায় যথাযথ মান অনুসরণ করা হয়নি। বিএসটিআইয়ের অন্যান্য বাংলাদেশ মান যেমন, ওয়েফার বিস্কুট, চকলেটের স্ট্যান্ডার্ডকে কিটক্যাট পরীক্ষার সময় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে প্যারামিটারের নাম এক হলেও পণ্যভেদে রেসিপি অনুসারে ফলাফল হেরফের হওয়া স্বাভাবিক। এই পরীক্ষা সঠিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

কিটক্যাটে অম্লতা বেশি

বিএসটিআইয়ের খসড়া মানদণ্ডের একটি কপি এসেছে স্ট্রিমের হাতে। সেখানে দেখা গেছে, চকলেট কোটেড ওয়েফারে সর্বোচ্চ আর্দ্রতা ৬, অ্যাসিড দ্রবণীয় ছাই ১ ও অম্লতা থাকতে হবে ২ শতাংশ। তবে ডিএসসিসির পরীক্ষায় অম্লতা পাওয়া গেছে ২ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ, বিএসটিআই নির্ধারিত মানের তুলনায় শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি।

মানহীন খাদ্য পণ্য যেন বাজারজাত না হয়, সে বিষয়ে সরকারি সংস্থার কার্যকর ভূমিকা চান খাদ্য বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ স্ট্রিমকে বলেন, নেসলে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠান। এমন একটা প্রতিষ্ঠানের পণ্যের গুণগত মান খারাপ হওয়া প্রত্যাশিত নয়। রিপোর্টেড কোম্পানি হিসেবে তাদের নিজস্ব মান বজায় রাখা উচিত।

আইন থাকলেও কার্যকর কম জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের যেসব আইন-কানুন ও বিভিন্ন অথরিটি আছে–সংস্থাগুলোর তৎপর হতে হবে। শুধু নেসলে নয়, খাদ্যপণ্য যারা তৈরি করছে, বাংলাদেশি কোম্পানি হলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা অথরিটি বা সংশ্লিষ্ট যেসব সংস্থা আছে, তারা কার্যকর হলে মানহীন পণ্য উৎপাদন পর্যায়ে আটকে যেত।’

ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আবদুল হামিদ আরও বলেন, ‘এদেশে গ্রাহকরা সচেতন নন। আবার তাদের কাছে তথ্যগুলো সহজে পৌঁছায় না। মূল কাজ সংস্থাগুলোর হলেও নিজ উদ্যোগে গ্রাহকদের যতটা সম্ভব সতর্ক থাকতে হবে।’

দেশে দেশে বিতর্ক

নেসলে শিশুখাদ্য, বোতলজাত পানীয়, কফি, দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও বিশ্বে বাজারজাত করে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিভিন্ন দেশে তাদের অনেক পণ্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মামলার পর প্রত্যাহার করতে হয়েছে কোটি কোটি টাকার পণ্য।

ভারতেও নেসলে তাদের পণ্য নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কে পড়ে। ২০১৫ সালে তাদের প্রসিদ্ধ খাদ্যপণ্য ম্যাগি নুডলসে অতিরিক্ত পরিমাণে ‘সিসা’ ও ‘মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট’ পায় ভারত সরকার। পরে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। বাজার থেকে প্রায় ৪০ কোটি প্যাকেট নুডলস প্রত্যাহার করে নেসলে। পরে খাদ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বাজারে ফেরে ম্যাগি।

যুক্তরাষ্ট্রে নেসলের শিশুখাদ্য পণ্যে আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও পারদের মতো পাওয়া ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। এ নিয়ে একাধিক মামলাও হয়েছে। ২০০৫ সালে ইউরোপে প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত কালি থেকে ‘আইসোপ্রোপাইল থায়োক্সানথোন’ নামে রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগে ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগাল থেকে লাখ লাখ লিটার লিকুইড বেবি মিল্ক প্রত্যাহার করে নেসলে। ওই সময় শুধু ইতালিতেই প্রায় ৩০ মিলিয়ন লিটার পণ্য বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

২০২১ সালে ফ্রান্সে নেসলের পণ্যে ক্যানসার সৃষ্টিকারী কেমিক্যাল ‘ইথিলিন অক্সাইড’ শনাক্ত হয়। পরে ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে নেসলের আইসক্রিমসহ একাধিক পণ্য প্রত্যাহার করা হয়।

এছাড়া ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে নেসলের কিটক্যাটের কিছু ব্যাচে প্লাস্টিকের টুকরো পাওয়া যায়। পরে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, মাল্টা, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও কানাডা থেকে ‘কিটক্যাট চাংকি’র চারটি বিশেষ ফ্লেভার প্রত্যাহার করে নেসলে।

কিটক্যাট প্রথম বাজারে আসে ‘রাউনট্রিজ চকলেট ক্রিস্প’ নামে। ১৯৮৮ সালে নেসলে ব্র্যান্ডটি অধিগ্রহণ করে ‘কিটক্যাট’ নামে বাজারজাত করে। বিশ্বের অনেক দেশে কিটক্যাট সরাসরি পণ্যটি উৎপাদন করে। তবে আমদানি করে কিটক্যাট বাজারজাত করে নেসলে বাংলাদেশ।